সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিবেশীদের সঙ্গে শত্রুতা নেই, তবে হামলার সুযোগ দিলে পরিণতি ভয়াবহ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৫০ পিএম

প্রতিবেশীদের সঙ্গে শত্রুতা নেই, তবে হামলার সুযোগ দিলে পরিণতি ভয়াবহ
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমশ বাড়তে থাকা উত্তেজনার পটভূমিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি এক সুনির্দিষ্ট ও দ্বৈত বার্তা প্রদান করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আঞ্চলিক কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের পূর্বশত্রুতা বা সংঘাতের ইচ্ছা নেই।

 

তবে এর পাশাপাশি একটি কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করা হয়েছে। ইরান দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র যদি পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সামান্যতম সুযোগও প্রদান করে, তবে তেহরান নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না।

 

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতময় পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ যে ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছিল, তার পেছনে মূলত ওই দেশগুলোর মার্কিন নির্ভরতা এবং ইরানের প্রতি বৈরী অবস্থানই দায়ী বলে দাবি করেছে তেহরান।

 

বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘোষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরপরই ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলার জোরালো গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

 

সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অবস্থানটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই। তিনি অত্যন্ত জোরালো ও কূটনৈতিক ভাষায় আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য তার নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।

 

তিনি বলেন, কিছু নির্দিষ্ট দেশের ভূখণ্ড এবং আকাশসীমা ব্যবহার করে যখন ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয় এবং ইরানের সাধারণ নাগরিকদের জীবন সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা হয়, তখন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের পক্ষে কোনোভাবেই চুপ করে থাকা সম্ভব নয়।

 

আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আত্মরক্ষার যে অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে, ইরান মূলত সেই অধিকারেরই প্রয়োগ করেছে বলে তিনি ইঙ্গিত প্রদান করেন। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওইসব দেশগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার পারদ যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে একাধিক আরব দেশে ইরানের পাল্টা আঘাত হানার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

 

সেই স্পর্শকাতর প্রসঙ্গের দিকে সরাসরি ইঙ্গিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ওই দেশগুলো মূলত তাদের নিজস্ব ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি এবং কৌশলগত ভুলের কারণেই হামলার শিকার হতে বাধ্য হয়েছিল।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার প্রধান কারণ হলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এসব আঞ্চলিক দেশের অত্যধিক ও অন্ধ নির্ভরতা।

 

শুধু তাই নয়, তিনি এমন একটি মারাত্মক দাবিও উত্থাপন করেন যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো সরাসরি ইরানের ওপর পরিচালিত আগ্রাসনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল। এর ফলেই ইরানকে বাধ্য হয়ে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আস্থার বিষয়টি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং তা কীভাবে বজায় রাখতে হয়, সে বিষয়েও ইরানের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। ইসমাইল বাঘেই তার বক্তব্যে আস্থার সংকট এবং তা পুনরুদ্ধারের উপায় নিয়ে গভীর দার্শনিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, বিশ্বাস অর্জন বা আস্থা স্থাপন কখনোই একতরফাভাবে হতে পারে না; এটি একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে তেহরানের অবস্থান হলো, তারা প্রতিবেশীদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তবে তার বিনিময়ে তাদের একটি ন্যূনতম এবং যৌক্তিক প্রত্যাশা রয়েছে।

 

আর সেই প্রত্যাশাটি হলো, আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের নিজস্ব মাটি, আকাশসীমা বা সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো ধরনের আগ্রাসন বা হামলার সুযোগ শত্রুদের করে দেবে না। যদি এই শর্তটি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে পালিত হয়, তবেই কেবল মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে ইরান মনে করে।

 

এই সতর্কবার্তার পেছনে একটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎক্ষণিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল অবস্থাকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এই মর্মে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পরপরই ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।

 

মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ইতিহাস নতুন নয়। মূলত এই আসন্ন বিপদের পূর্বাভাস পেয়েই ইরান আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক নীতির বিষয়টি পরিষ্কার করে দিচ্ছে।

 

তেহরান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুমকি দিয়েছে যে, যদি এবার যুক্তরাষ্ট্র বা তার কোনো মিত্র নতুন করে ইরানের ওপর হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ইরান আর আগের মতো কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমার মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ রেখে কেবল আনুপাতিক পাল্টা হামলা চালাবে না।

 

বরং এবার ইরানের দিক থেকে যে প্রতিশোধমূলক আঘাত আসবে, তা হবে নজিরবিহীনভাবে তীব্র, কঠোর এবং সর্বব্যাপী। ইরানের এই নতুন সামরিক ডকট্রিন বা নীতি ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা এক ধরনের কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবেই দেখছেন।

 

তেহরান মূলত ওয়াশিংটন এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের এই বার্তা দিতে চাইছে যে, ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ালে তার পরিণতি শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে।

 

বিশেষ করে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুটগুলো এই সংঘাতের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর আগে কাতারের একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার পাকিস্তানে যাওয়ার পথে হরমুজ প্রণালিতে হামলার শিকার হওয়ার যে ঘটনা ঘটেছিল, তা এই অঞ্চলের জলপথের চরম নিরাপত্তাহীনতাকেই প্রমাণ করে।

 

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের এই কঠোর অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত। সবশেষে, ইরানের এই বিবৃতি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।

 

একদিকে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত এবং সামরিক জোট, অন্যদিকে শক্তিশালী ও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে থাকা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের চরম প্রতিশোধের হুমকি-এই দুইয়ের মাঝে পড়ে আরব রাষ্ট্রগুলোকে এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হবে।

 

ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই নিতে হবে এবং বহিরাগত কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে কখনোই স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ওয়াশিংটনের নতুন নীতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইরানের এই চূড়ান্ত সতর্কবার্তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে।

 

বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ইরানের এই বিবৃতি নিছক কোনো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক বার্তা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য এখন এমন একটি সুতোর ওপর ঝুলছে, যেখানে একটি মাত্র ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে এক ধ্বংসাত্মক এবং সর্বগ্রাসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

ইরান যেমন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও তার বৈশ্বিক আধিপত্য এবং মিত্রদের নিরাপত্তার অজুহাতে সামরিক শক্তি প্রদর্শনে পিছপা হচ্ছে না। এই দুই পরস্পরবিরোধী শক্তির দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা যে কতটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তা সহজেই অনুমেয়।

 

তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তিগুলোর উচিত এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নীরব না থেকে দ্রুত এবং কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

 

- আল জাজিরা