তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে যদি ইরানের ওপর নতুন করে কোনো মাত্রার সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়, তবে সেই যুদ্ধের ব্যাপ্তি এবং সময়কাল অতীত বা আগের যেকোনো সংঘাতের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ হবে।
এই হুঁশিয়ারির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের বিবৃতিতে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উল্লেখ করে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো তার নির্বাহী ক্ষমতাবলে একটি যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দিতে পারবেন, কিন্তু সেই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ঠিক কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, তা এককভাবে নির্ধারণ করার কোনো ক্ষমতাই তার বা মার্কিন প্রশাসনের হাতে থাকবে না।
এই কঠোর এবং আত্মবিশ্বাসী বার্তার মাধ্যমে ইরান মূলত তাদের অটুট সামরিক মনোবল এবং দীর্ঘমেয়াদি যেকোনো প্রতিরোধ যুদ্ধের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়টিই গোটা বিশ্বের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
দেশের সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি অত্যন্ত দৃঢ় ও আগ্রাসী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। সম্ভাব্য যেকোনো বিদেশি সামরিক হামলার বিপরীতে ইরানের কৌশলগত জবাব কেমন হবে, সে সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে গিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বিন্দুমাত্র আঘাত এলে তার অত্যন্ত "সমানুপাতিক, চূড়ান্ত এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী জবাব" নিশ্চিতভাবে দেওয়া হবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই সুচিন্তিত শব্দচয়ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, এর মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের পালটা আঘাত কেবল সামরিক দিক থেকেই ধ্বংসাত্মক হবে না, বরং তা আক্রমণকারীদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও এক বিশাল ও অপূরণীয় ধাক্কা দিতে সক্ষম হবে।
সম্ভাব্য শত্রুপক্ষকে সরাসরি সতর্ক করে দিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তার বক্তব্যে আরও যোগ করেন, "যারা আজ আমাদের দিকে অকারণে হুমকির আঙুল তুলছে এবং সামরিক আগ্রাসনের দুঃস্বপ্ন দেখছে, তারা কোনোভাবেই আমাদের প্রতিরক্ষামূলক জবাবের পরিধি, এর উপযুক্ত সময়কাল বা চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করার সামান্যতম ক্ষমতাও রাখবে না।"
অর্থাৎ, ইরান সম্পূর্ণভাবে তাদের সুবিধামতো সময়ে, নিজেদের পূর্বনির্ধারিত রণকৌশল অনুযায়ী এবং শত্রুর জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত উপায়ে আঘাত হানবে, যা আক্রমণকারীদের সামরিক ও কূটনৈতিক সমস্ত হিসাব-নিকাশ মুহূর্তের মধ্যে পালটে দিতে বাধ্য করবে।
ইরানি সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের এই ধারাবাহিক এবং সম্মিলিত হুঁশিয়ারি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
তেহরানের নীতিনির্ধারকরা সাম্প্রতিক সময়ে বারবার এই স্পর্শকাতর বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে সামনে নিয়ে আসছেন যে, পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যদি নতুন করে কোনো সর্বাত্মক সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়, তবে তা কিছুতেই একটি নির্দিষ্ট বা স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে না।
বরং তা এক অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী, ব্যয়বহুল এবং রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করবে। তেহরানের এই অটল আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে তাদের নিজস্ব দুর্গম ভৌগোলিক সুবিধা, সুবিশাল ও প্রশিক্ষিত সামরিক জনবল এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের বিভিন্ন মিত্র ও সমমনা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এক অত্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।
ইরানি নেতৃবৃন্দ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে মূলত এই চরম সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক পরাশক্তি হওয়ার সুবাদে আমেরিকা হয়তো প্রথম আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে, কিন্তু যুদ্ধের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করা বা নিজেদের ইচ্ছেমতো সেই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের ইতি টানার চাবিকাঠি কোনোভাবেই ওয়াশিংটনের হাতে সুরক্ষিত থাকবে না।
একটি যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, তা শেষ করা যে বাস্তবে কতটা কঠিন ও বিপর্যয়কর হতে পারে, ঠিক সেই নিদারুণ বাস্তবতার দিকেই বারবার নির্দেশ করেছে ইরান। বর্তমানের এই চরম উত্তেজনাকর এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির শেকড় অনুসন্ধান করতে গেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ফিরে তাকাতে হবে সাম্প্রতিক অতীতের এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন সংঘাতের দিকে।
চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রধান মিত্র ইসরায়েল সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ইরানের ওপর যে আকস্মিক ও সর্বাত্মক আক্রমণ চালিয়েছিল, তার গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকায়নি।
সেই আক্রমণাত্মক ও একতরফা পদক্ষেপের পরপরই পুরো মধ্যপ্রাচ্য যেন এক ভয়াবহ যুদ্ধের আগুনে পরিণত হয়েছিল, যা বিশ্বশান্তিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয়। ২৮শে ফেব্রুয়ারির সেই প্রথম আঘাতের পর টানা প্রায় চল্লিশ দিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত ভারী, তীব্র এবং ব্যাপক ধ্বংসাত্মক সামরিক সংঘাত চলেছিল।
আকাশপথে অবিরাম বিমান হামলা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং অত্যাধুনিক ড্রোন হামলার মতো প্রাণঘাতী সমরাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে ওই দীর্ঘ চল্লিশ দিন পুরো অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিপতিত হয়েছিল।
সামরিক ঘাঁটি ও বেসামরিক অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি এবং মর্মান্তিক প্রাণহানির মধ্য দিয়ে এই সংঘাত বিশ্ববাসীকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছিল যে, আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত দুই সামরিক শক্তির সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান সামগ্রিক মানবতার জন্য ঠিক কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
টানা চল্লিশ দিনের সেই রক্তক্ষয়ী, ধ্বংসাত্মক এবং শ্বাসরুদ্ধকর ভারী সামরিক সংঘাতের তীব্রতা শেষ পর্যন্ত এপ্রিল মাসের দিকে এসে কিছুটা স্তিমিত হতে শুরু করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই সময় যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক কোনো সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়নি বা বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়নি।
বরং সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ ক্রমশ পরিবর্তন হয়ে তা এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ছায়াযুদ্ধ বা বিক্ষিপ্ত প্রতিশোধমূলক হামলায় রূপ নেয়। এপ্রিলের পর থেকে সংঘাতের ধরন বদলে যায় এবং উভয় পক্ষই একে অপরের কৌশলগত সামরিক স্থাপনা বা মিত্রদের ওপর বিক্ষিপ্তভাবে প্রতিশোধমূলক পালটাপালটি আঘাত হানার এক নতুন নীতি গ্রহণ করে।
সামরিক ভাষায় এই ধরনের বিক্ষিপ্ত হামলাগুলো মূলত একে অপরের চূড়ান্ত শক্তি পরীক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবেই কাজ করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি, ক্লান্তিকর ও অনিয়মিত সংঘাতের সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান আজ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, তারা দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় যেকোনো বৈরী পরিস্থিতিতে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ সক্ষমতা রাখে।
২৮শে ফেব্রুয়ারির সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিনা উসকানিতে শুরু হওয়া যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতাই মূলত বর্তমান ইরানের এই আপসহীন সামরিক নীতি এবং অত্যন্ত কঠোর প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের মূল ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের সর্বসম্মত মতে, চরম সংকটময় এই মুহূর্তে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘির এই সময়োচিত ও কড়া বিবৃতিকে কেবলই কোনো ফাঁকা আওয়াজ বা সস্তা রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এর পেছনে স্পষ্টভাবে লুকিয়ে রয়েছে তেহরানের সুগভীর সামরিক প্রস্তুতি, আধুনিক সমরাস্ত্রের মজুত এবং যেকোনো মূল্যে নিজেদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক ইস্পাতকঠিন ও অদম্য মানসিকতা।
রাজনৈতিক দিক থেকে ইরান এটি ভালোভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে যে, পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তাদের এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব কেবল সামরিক সমরাস্ত্র বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এক জটিল স্নায়ুযুদ্ধ এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েরও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে প্রকাশ্য সতর্কবার্তা দেওয়ার মূল অর্থ হলো, ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে আমেরিকান সাধারণ ভোটার, মার্কিন কংগ্রেস এবং সেখানকার নীতিনির্ধারকদের ওপরও এক ধরনের পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।
এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো, মার্কিন প্রশাসন যেন অভ্যন্তরীণ চাপে পড়ে নতুন করে কোনো হটকারী, অপরিকল্পিত এবং আত্মঘাতী সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ বিরত রাখে। পরিশেষে বলা যায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অত্যন্ত জটিল, স্পর্শকাতর ও বারুদপূর্ণ রণক্ষেত্রে নতুন করে বড় কোনো সংঘাত বেধে গেলে তা কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যই এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না, বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অপূরণীয় ধস নামাবে।
তাই বর্তমান এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শান্তি রক্ষার বল এখন সম্পূর্ণরূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে অবস্থান করছে। ইরান তাদের দিক থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা নিজে থেকে কোনো যুদ্ধের প্রথম উসকানিদাতা হতে চায় না।
কিন্তু যদি তাদের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বা সার্বভৌমত্বের ওপর সামান্যতম কোনো আঘাত আসে, তবে তারা বাধ্য হয়ে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি ও মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে, যার শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বিশ্বের কোনো পরাশক্তিই আগে থেকে নির্ধারণ বা অনুমান করতে পারবে না। চরম অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসের এই প্রবল আশঙ্কাই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়কে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।