সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধ অবসানে খসড়া প্রস্তাব পর্যালোচনা, ইরানি প্রতিনিধিদের দোহা ত্যাগ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম

যুদ্ধ অবসানে খসড়া প্রস্তাব পর্যালোচনা, ইরানি প্রতিনিধিদের দোহা ত্যাগ
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত। এই যুদ্ধাবস্থার একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের খোঁজে দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে এবং প্রকাশ্যে নানা ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

 

এই শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র কাতারের রাজধানী দোহায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় বসা ইরানি আলোচক দলের সদস্যরা ইতোমধ্যে দোহা ত্যাগ করেছেন।

 

বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স সোমবার এই বৈঠকের বিষয়ে সরাসরি অবগত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে তাদের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, প্রতিনিধিরা ফিরে গেলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি, কারণ সম্ভাব্য একটি চুক্তির রূপরেখা বা খসড়া প্রস্তাব নিয়ে বর্তমানে উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।

 

পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে আগামী দিনগুলোতে আবারও উভয় পক্ষের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে আরও বিশদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানি প্রতিনিধি দলটি মূলত গত রোববার কাতার ত্যাগ করে নিজেদের দেশে ফিরে গেছে। তবে আন্তর্জাতিক মহলে যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা হতাশার সৃষ্টি না হয়, সেজন্য ওই সূত্রটি একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে।

 

তিনি জানিয়েছেন, আলোচনায় কোনো ধরনের অচলাবস্থা, জটিলতা বা মতবিরোধের কারণে ইরানি প্রতিনিধিরা দোহা ত্যাগ করেননি। বরং এটি ছিল তাদের পূর্বনির্ধারিত সূচির একটি অংশ এবং তারা মূলত একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে নিজেদের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আরও বিশদভাবে পর্যালোচনার জন্যই দেশে ফিরে গেছেন।

 

তবে সেই খসড়া প্রস্তাবে ঠিক কী কী শর্ত বা রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং চলমান আলোচনার চরম সংবেদনশীলতার কারণেই হয়তো এই গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

দোহায় অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু সম্পর্কে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, মূলত গত সেপ্টেম্বর মাসে তেহরানের পক্ষ থেকে তৈরি করা একটি সাত দফার শান্তি পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করেই দোহায় এই আলোচনা আবর্তিত হয়েছে।

 

এই সাত দফা পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বিশ্ববাণিজ্যের জন্য সম্পূর্ণভাবে চালু করা এবং একইসঙ্গে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর নৌ অবরোধের নিঃশর্ত অবসান ঘটানো।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত এই হরমুজ প্রণালির ওপর বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল। তেহরানের পক্ষ থেকে এমন একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, যদি উভয় পক্ষের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য এবং সম্মানজনক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে এই সাত দফা প্রস্তাবিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।

 

এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ইরানের কৌশলগত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয়।

 

সেই প্রয়োজনীয়তা মেটাতেই কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে বার্তা আদান-প্রদান সহজতর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি গত কয়েকদিন ধরে দোহায় অবস্থান করছিলেন।

 

ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, তাদের দেশের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে, তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে তাদের এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত।

 

মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তার বক্তব্যে ইরানের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মূল দাবিগুলো মানা হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো ধরনের চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত অন্যায় নৌ অবরোধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটাতে হবে, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী ইরানের সকল ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং দেশের সার্বিক প্রয়োজনীয়তাগুলো পূরণ করতে হবে।

 

এর অন্যথা হলে কোনো অবস্থাতেই চূড়ান্ত কোনো চুক্তি সই করবে না তেহরান। এমনকি তিনি এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই মৌলিক দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা বা এর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

অর্থাৎ, ইরান তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দিতে যে প্রস্তুত নয়, তা এই বক্তব্যের মাধ্যমে অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। এর আগে গত শনিবার কাতারের স্বনামধন্য সম্প্রচারমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ এবং তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সময়সীমা নিয়ে একটি নতুন এবং আশাব্যঞ্জক তথ্য প্রদান করেন।

 

তিনি জানান যে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়ার বিষয়ে যে সাত দিনের একটি দীর্ঘায়িত পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা চাইলে আরও অনেক কম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই সাত দিনের সময়সীমাকে কমিয়ে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে। তার এই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে, ইরান দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকটের সমাধান চায়, যদি তাদের শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করা হয়।

 

তবে এই শান্তি প্রক্রিয়া খুব একটা মসৃণ পথে এগোচ্ছে না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, ইরানের দেওয়া এই প্রাথমিক সাত দফা প্রস্তাবটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। ট্রাম্পের এই প্রত্যাখ্যানের ফলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে রূপ ধারণ করেছে।

 

আগামী মঙ্গলবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এই মর্মে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে যে, এই নির্বাচনের ডামাডোল শেষ হওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত ফের এক নতুন মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

এমন একটি ভয়াবহ আশঙ্কার ছায়াতেই সর্বশেষ দফায় দোহায় এই কূটনৈতিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে কি না-এমন এক প্রশ্নের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মন্তব্য করেছেন।

 

তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাতারাতি নতুন কোনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হবে বলে তেহরান মনে করে না, অর্থাৎ মার্কিন রাষ্ট্রীয় নীতি ইরানের প্রতি বৈরীই থেকে যাবে বলে তারা ধারণা করছেন।

 

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি তার ভোটার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালাবে না যুক্তরাষ্ট্র।

 

একইসঙ্গে তিনি এটিও দাবি করেছেন যে, তেহরানের সঙ্গে তাদের বেশ ফলপ্রসূ এবং ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই আপাত শান্ত অবস্থানের আড়ালে তিনি একটি প্রচ্ছন্ন হুমকিও জিইয়ে রেখেছেন। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তিনি একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

 

সব মিলিয়ে, দোহায় ইরানি প্রতিনিধিদের খসড়া প্রস্তাব রেখে ফিরে যাওয়া, মার্কিন নির্বাচনের উত্তেজনা এবং উভয় পক্ষের অনড় অবস্থান-এই সবকিছু মিলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল এবং ভঙ্গুর সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই খসড়া চুক্তির পরিণতি কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার এক বিশাল সমীকরণ।

 

- রয়টার্স