মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা অসম্ভব, দৃঢ় প্রত্যয় পেজেশকিয়ানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:০১ পিএম

ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা অসম্ভব, দৃঢ় প্রত্যয় পেজেশকিয়ানের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর নানামুখী চাপের মুখে নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা আবারও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশের ওপর আরোপিত সামরিক ও অর্থনৈতিক হুমকির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো শত্রু রাষ্ট্রই যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে কখনোই আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবে না।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তেহরান একদিকে যেমন যেকোনো যৌক্তিক আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকট সমাধানের নীতিতে বিশ্বাসী, ঠিক তেমনি অন্যদিকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন বা অসংগত দাবির কাছে মাথা নত না করে তার বিরুদ্ধে এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

 

সোমবার ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর এবং বড় শহরগুলোর মেয়রদের সঙ্গে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় নিরাপত্তার নানাদিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট এই সময়োপযোগী ও বলিষ্ঠ মন্তব্য করেন।

 

মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্টের এই শক্ত অবস্থানের কথা আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনা হয়। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর বক্তব্যে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কূটনীতি এবং আলোচনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেন।

 

তিনি মনে করেন, যুদ্ধ কখনোই কোনো দেশ বা জাতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে না। সংঘাত ও রক্তপাত কেবল ধ্বংসযজ্ঞই ডেকে আনে, যার ফলে কোনো পক্ষেরই দীর্ঘমেয়াদি কোনো লাভ হয় না।

 

এই নীতিগত অবস্থান থেকেই তাঁর নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন যেকোনো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমস্যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং গঠনমূলক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

এই কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোকে আরও ফলপ্রসূ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বর্তমান সরকারকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন বলেও প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত করেন।

 

এই বিশেষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসন এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরও স্বাধীনভাবে দরকষাকষি এবং দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। তবে কূটনীতির প্রতি এই আগ্রহকে কোনোভাবেই ইরানের দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলে তিনি সতর্ক করে দেন।

 

প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শত্রুদের যেকোনো মিথ্যাচার, অপপ্রচার এবং অতিরিক্ত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দাবির বিরুদ্ধে তেহরান অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াবে।

 

সামরিক হুমকির পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অর্থনৈতিক যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়েও বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক ও লাভজনক সীমান্ত বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের পথে পশ্চিমা বিশ্বসহ বিভিন্ন শত্রু রাষ্ট্র যেভাবে প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করছে এবং নিত্যনতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের অপচেষ্টা চালাচ্ছে, সে বিষয়টি তিনি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন।

 

তিনি দেশের নীতিনির্ধারকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, শত্রুদের মূল লক্ষ্যই হলো চারপাশ থেকে সীমানা বন্ধ করে দিয়ে এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যাহত করে ইরানের জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া।

 

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে ফেলে দেশের ভেতরে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করা এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নামিয়ে আনাই তাদের প্রধান রাজনৈতিক কৌশল।

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শক্তির তরফ থেকে ইরানের ওপর নতুন করে দফায় দফায় যে প্রচ্ছন্ন হামলা এবং অর্থনৈতিক অবরোধের খড়্গ নেমে এসেছে, প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে সেই বিষয়গুলোর প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন।

 

তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং সুচিন্তিত অর্থনৈতিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধের কার্যকর মোকাবিলা করা সম্ভব।

 

দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে এবং বহিঃশত্রুর বহুমুখী আক্রমণ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। প্রাদেশিক গভর্নর এবং সিটি মেয়রদের উদ্দেশে দেওয়া দিকনির্দেশনামূলক এই বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শত্রুদের তৈরি করা কৃত্রিম চ্যালেঞ্জ এবং চাপিয়ে দেওয়া এই গভীর সংকট থেকে দেশকে সফলভাবে বের করে আনতে হলে আপামর জনসাধারণের নিঃশর্ত সংহতি এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

 

কোনো দেশের সরকার বা প্রশাসন এককভাবে এই ধরনের আন্তর্জাতিক আগ্রাসন বা ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারে না, যদি না সেই দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের পাশে পাহাড়ের মতো অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা মতবিরোধ ভুলে এখন সময় এসেছে একতাবদ্ধ হওয়ার।

 

জনগণ যদি তাদের নির্বাচিত সরকার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে পৃথিবীর যেকোনো পরাশক্তির চক্রান্ত ও অশুভ পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়া সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আবেগঘন অথচ প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ যদি আমাদের ওপর আস্থা রাখে এবং আমাদের প্রতিটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে সমর্থন জোগায়, তবে আমরা পূর্ণ রাষ্ট্রীয় শক্তির সঙ্গে শত্রুদের যেকোনো আগ্রাসনের কঠোরতম মোকাবিলা করতে পারব এবং তাদের সমস্ত ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হব।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে যেমন একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে ইরানও কৌশলগতভাবে প্রাচ্যের শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যমে সেই চাপ মোকাবিলা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইরান কখনোই বহিঃশত্রুর খবরদারি মেনে নেয়নি। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা প্রমাণ করেছে যে, চরম প্রতিকূলতা এবং আন্তর্জাতিক একঘরে অবস্থার মধ্যেও কীভাবে টিকে থাকতে হয় এবং নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন করতে হয়।

 

বর্তমান প্রশাসনের নীতিও সেই একই প্রতিরোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তারা একদিকে যেমন আলোচনার দরজা খোলা রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের সদিচ্ছার বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমে বাইরের যেকোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার মানসিকতাও প্রস্তুত করছে।

 

এটি মূলত ইরানের সেই চিরচেনা প্রতিরোধের কূটনীতি, যেখানে তারা প্রমাণ করতে চায় যে বলপ্রয়োগ বা অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতিকে কখনোই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা যায় না।

 

পরিশেষে বলা যায়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণাই নয়, বরং এটি সমগ্র ইরানি জাতির জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক নির্দেশিকা। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন যে, সামনে হয়তো আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, কিন্তু সেই প্রতিকূলতা মোকাবিলার শক্তিও তাদের নিজেদের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

 

রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যদি একটি নিশ্ছিদ্র সেতুবন্ধ তৈরি করা যায়, তবে শত্রুদের যেকোনো সামরিক আগ্রাসন বা অর্থনৈতিক যুদ্ধের ষড়যন্ত্র তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

 

আলোচনার টেবিলে নিজেদের অধিকার আদায়ে অবিচল থাকা এবং প্রয়োজনে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা-এই দ্বিমুখী কৌশলেই ইরান তার ভবিষ্যৎ পথচলা নির্ধারণ করেছে। বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এই নিরন্তর সংগ্রামে তেহরান যে একচুলও ছাড় দিতে রাজি নয়, তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে প্রতিফলিত প্রেসিডেন্টের এই বলিষ্ঠ উচ্চারণ তারই এক অকাট্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।

 

- তাসনিম নিউজ এজেন্সি