বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানকে সহায়তার জেরে ভারত ও তুরস্কের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:১০ পিএম

ইরানকে সহায়তার জেরে ভারত ও তুরস্কের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও একটি অত্যন্ত কঠোর ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখা এবং ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সম্পূর্ণরূপে দুর্বল করে দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বুধবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে ভারত ও তুরস্কভিত্তিক বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

 

বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ ভারত ও তুরস্ক উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটন তার বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অবরোধের ক্ষেত্রে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ভারতের যে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এই নিষেধাজ্ঞার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভারতের নাগরিক সুনীল কুমার শর্মা। তার পাশাপাশি তার স্ত্রী জাসপ্রিত প্রীতি শহিদ এবং তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত আরও দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

 

ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি সুনীল কুমার শর্মার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট মোট নয়টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ওপরও এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হয়েছে যে, শর্মার নেতৃত্বাধীন একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অপরিশোধিত তেল পরিবহনে নিয়োজিত এমন সব জাহাজকে সহায়তা করে আসছিল, যেগুলোর ওপর আগে থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল।

 

আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবৈধভাবে তেল পরিবহনের এই চাঞ্চল্যকর প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, শর্মার এই নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত সুকৌশলে ওইসব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজগুলোকে সম্পূর্ণ ভুয়া পতাকা এবং জাল নৌযান সনদ সরবরাহ করে আসছিল।

 

এই ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিশ্বজুড়ে অবাধে ইরানের তেল পরিবহন করছিল। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখ করেছে যে, এই ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর মধ্যে এমন অনেক নৌযান রয়েছে, যেগুলো সরাসরি ইরানের সামরিক বাহিনী এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্র ও সহযোগীদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে থাকে।

 

এর অর্থ দাঁড়ায়, এই তেল বিক্রির লভ্যাংশ সরাসরি ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

সমুদ্রপথের পাশাপাশি আকাশপথেও ইরানের যোগাযোগ ও লজিস্টিক সহায়তা চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে তুরস্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এভিয়েশন বা বিমান চলাচল সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ওয়াশিংটন খড়্গহস্ত হয়েছে।

 

তুরস্কভিত্তিক ‘ফুগো গ্রাউন্ড সার্ভিসেস ইনকরপোরেশন’ নামের এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট অভিযোগ হলো, এই তুর্কি প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত একাধিক ইরানি যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান সংস্থাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংসহ বিভিন্ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত সেবা দিয়ে আসছিল।

 

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং একটি অপরিহার্য সেবা, যা ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক বা কার্গো বিমানের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।

 

ফুগো গ্রাউন্ড সার্ভিসেসের মতো প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের সহায়তার কারণেই ইরানের বিমান সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছিল, যা ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অবরোধের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছিল।

 

বর্তমান মার্কিন প্রশাসন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন সরকার, ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বা অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে করে দেওয়ার একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করছে।

 

সদ্য ঘোষিত এই নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক যুদ্ধেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অভিযানের প্রধান ও অঘোষিত লক্ষ্য হলো বিশ্ববাজারে ইরানের তেল বিক্রির সক্ষমতা একদম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, যাতে করে দেশটির রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে যুদ্ধের অর্থায়নের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়।

 

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি একটি কড়া সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন যে, স্থল, সমুদ্র কিংবা আকাশপথ-যেকোনো মাধ্যম ব্যবহার করে যারা ইরান সরকারকে বিন্দুমাত্র সহায়তা করার চেষ্টা করবে বা তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে, তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে। কেউ এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকতে পারবে না।

 

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, তাদের এই ধারাবাহিক, নিরবচ্ছিন্ন ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতি ইতোমধ্যে এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।

 

গত সপ্তাহে প্রকাশিত মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ে ইরানের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।

 

দেশটির জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর পাশাপাশি, দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে এবং মূল্যস্ফীতির হার এক লাফে প্রায় নব্বই শতাংশে পৌঁছেছে।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো দেশের মূল্যস্ফীতি এই পর্যায়ে পৌঁছানোর অর্থ হলো সে দেশের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ব্যাহত হওয়া এবং দেশে একটি সম্ভাব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি হওয়া।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যেভাবে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, তা বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রার সংযোজন। এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের আপস করতে মোটেও প্রস্তুত নয়।

 

যদিও এই পদক্ষেপের ফলে ভারত ও তুরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাময়িক একটি টানাপোড়েন বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, তবে ওয়াশিংটন মনে করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং তাদের নিজেদের ভূ-কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য।

 

পরিশেষে বলা যায়, এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সকল দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি অত্যন্ত কড়া ও সুস্পষ্ট বার্তা হিসেবে কাজ করবে যে, মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে লাভজনক হলেও কোনো ধরনের চোরাচালান বা অবৈধ সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়াটা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী দিনগুলোতে এই অর্থনৈতিক চাপ ইরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, এখন সারা বিশ্বের নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।

 

- মিডল ইস্ট আই