বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে বিপর্যয়ের পরও যুদ্ধংদেহী মার্কিন প্রশাসন পরাজিত জুয়াড়ির মতো - গালিবাফ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

নির্বাচনে বিপর্যয়ের পরও যুদ্ধংদেহী মার্কিন প্রশাসন পরাজিত জুয়াড়ির মতো - গালিবাফ
ছবি : File Photo

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের পর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

 

এই রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি অভাবনীয় মন্তব্যের সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

 

তিনি বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনকে এমন এক পরাজিত ও দিশেহারা জুয়াড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে খেলায় সর্বস্বান্ত হওয়ার পরও কোনোভাবেই জুয়ার টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে রাজি নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার বরাতে উঠে আসা এই তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চিরস্থায়ী উত্তেজনায় নতুন এক মাত্রা যুক্ত করেছে।

 

একই সঙ্গে এটি মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতাগুলোকেও বিশ্বের সামনে অত্যন্ত সুকৌশলে উন্মোচিত করেছে। ঘটনার মূল সূত্রপাত ঘটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী পোস্টকে কেন্দ্র করে।

 

ওই পোস্টে ভ্যান্স মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হতাশাজনক ফলাফলের প্রকৃত কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই তিনি সেখানে স্বীকার করে নেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ বা নতুন করে যুদ্ধের উন্মাদনা তৈরি করার বিষয়টি সাধারণ মার্কিন ভোটাররা মোটেও ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।

 

মার্কিন জনগণের এই যুদ্ধবিরোধী মনোভাব নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি তার লেখায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। একজন ক্ষমতাসীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে নিজেদের যুদ্ধংদেহী নীতির এমন প্রকাশ্য সমালোচনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দেয়।

 

ভ্যান্সের এই অপ্রত্যাশিত আত্মস্বীকৃতির পর বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সরাসরি পাল্টা আক্রমণ শানান ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

 

তিনি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অবস্থাকে একটি রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেন। গালিবাফ তার বার্তায় জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যের সূত্র ধরে লেখেন, এটি সম্পূর্ণভাবে একজন পরাজিত জুয়াড়ির মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।

 

যে জুয়াড়ি খেলায় হেরে গিয়েও নিজের পরাজয় ও ব্যর্থতা মেনে নিতে পারে না এবং খড়কুটো আঁকড়ে ধরে শেষবারের মতো ভাগ্য পরীক্ষার আশায় মরিয়া হয়ে জুয়ার টেবিলেই পড়ে থাকে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের অবস্থাও ঠিক তেমনই।

 

গালিবাফের এই মন্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যে দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বলপ্রয়োগের নীতির প্রতি এক চরম কটাক্ষ। ইরানি স্পিকার তার এই তীব্র সমালোচনা কেবল জুয়াড়ির রূপকেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক মধ্যপ্রাচ্য নীতি, বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতি তাদের নিঃশর্ত ও একপাক্ষিক সমর্থনের বিষয়টিকেও অত্যন্ত কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন।

 

তার মতে, এই অন্ধ ও ইসরায়েল-সর্বস্ব নীতির কারণেই যুক্তরাষ্ট্র আজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি চরম বিপজ্জনক খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাধারণ জনগণের সমর্থন হারিয়েও মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে কেবল ইসরায়েলের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থেই একতরফাভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি জোরালো অভিযোগ উত্থাপন করেন।

 

ফিলিস্তিন সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক অস্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই একচোখা নীতিকেই তিনি প্রধানত দায়ী করেন। গালিবাফের বার্তার সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ও আক্রমণাত্মক দিকটি ছিল জেডি ভ্যান্সকে উদ্দেশ্য করে করা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কটাক্ষ।

 

গালিবাফ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় ভ্যান্সকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বসে এসব বাহ্যিক জ্ঞানগর্ভ বয়ান দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, জেডি ভ্যান্স কেন তার এই গভীর উপলব্ধিগুলো নিজের 'বস' বা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গিয়ে বলছেন না?

 

গালিবাফ মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে, একদিকে ভ্যান্স জনসমক্ষে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায়ের জন্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবের কথা স্বীকার করছেন, অন্যদিকে তাদের মূল নেতা বা 'বস' ঠিকই পর্দার আড়ালে বসে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ও যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।

 

এই দ্বিমুখী ও কপট আচরণের কারণেই গালিবাফ মার্কিন প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গালিবাফ ও ভ্যান্সের মধ্যকার এই বাদানুবাদ নিছক কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ তর্ক নয়, বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক অত্যন্ত গভীর ও জটিল সমীকরণের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলো সাধারণত যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য একটি এসিড টেস্ট বা অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে কাজ করে থাকে। এই নির্বাচনে মার্কিন জনগণ তাদের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যা, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নীতিগত বিষয়গুলোর পাশাপাশি সরকারের বৈদেশিক নীতির ওপরও নিজেদের চূড়ান্ত রায় প্রদান করে থাকেন।

 

জেডি ভ্যান্সের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি থেকে এটি আজ একেবারে সুস্পষ্ট যে, মার্কিন জনগণ দূরবর্তী কোনো দেশে নতুন করে কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বা অর্থহীন সংঘাতের পক্ষে আর অবস্থান করছে না। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির স্মৃতি মার্কিন ভোটারদের মন থেকে এখনো মুছে যায়নি।

 

তারা প্রত্যাশা করে, সরকার দেশের বাইরের সংঘাতে অর্থ ব্যয় না করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলোতে অধিকতর মনোযোগ নিবদ্ধ করুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ-যাদেরকে গালিবাফ তার বার্তায় 'বস' বলে ইঙ্গিত করেছেন-তারা মূলত সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং যুদ্ধের হুমকির মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে চরমভাবে আগ্রহী।

 

পরাজিত জুয়াড়ির এই উপমাটি তাই বর্তমান আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। একজন জুয়াড়ি যখন তার মূলধন হারাতে শুরু করে, তখন সে তার যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং হারানো পুঁজি পুনরুদ্ধারের আশায় মরিয়া হয়ে আরও বড় ও বিপজ্জনক ঝুঁকি গ্রহণ করে।

 

গালিবাফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সরকার পরিবর্তন, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার যে অব্যাহত ব্যর্থ নীতি যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে অনুসরণ করে আসছে, তা তাদের জন্য বিন্দুমাত্র ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি।

 

উল্টো এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে তাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এত বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পরও মার্কিন প্রশাসন সেই একই ব্যর্থ ও আগ্রাসী নীতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে যাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে তাদেরকে সেই পরাজিত ও মরিয়া জুয়াড়ির আসনেই স্থায়ীভাবে বসিয়ে দিয়েছে।

 

অন্যদিকে, জেডি ভ্যান্সের মতো একজন শীর্ষস্থানীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকের এই ধরনের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দ্বন্দ্ব ও চরম অস্পষ্টতাকেও সমগ্র বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করেছে।

 

নির্বাচনের মাঠে যখন যুদ্ধের দামামা ও আগ্রাসী নীতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন জনসমর্থন ধরে রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক নেতারা সাময়িকভাবে তাদের সুর নরম করতে বাধ্য হন। কিন্তু ইরানের স্পিকার গালিবাফ এই নরম সুরকে স্রেফ একটি রাজনৈতিক কপটতা ও লোকদেখানো কৌশল হিসেবেই বিবেচনা করছেন।

 

তার দৃঢ় বিশ্বাস, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের এই উপলব্ধি যদি সত্যিই আন্তরিক ও বাস্তবসম্মত হতো, তবে তা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, অর্থাৎ স্বয়ং প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন নীতি নির্ধারণী কার্যক্রমে প্রতিফলিত হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তবে দেখতে পাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিপরীত চিত্র।

 

একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শান্তির বুলি ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান প্রচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক প্রস্তুতি, সমরাস্ত্র মোতায়েন ও উসকানিমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও জেডি ভ্যান্সের মধ্যকার এই ভার্চুয়াল বাগ্‌যুদ্ধ বিশ্ববাসীর সামনে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক বার্তা প্রদান করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বরফ এখনই গলার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই।

 

বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল টানাপোড়েন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মেরুকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চিরপরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ-এই দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও বেশি সংঘাতময় ও জটিল করে তুলেছে।

 

ইসরায়েল-সর্বস্ব নীতির অন্ধ অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র কবে এই পরাজিত জুয়াড়ির টেবিল থেকে স্বেচ্ছায় উঠে দাঁড়ানোর শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবে, নাকি গালিবাফের সতর্কবাণী অনুযায়ী সেই ভয়ংকর খাদের কিনার থেকে তাদের চূড়ান্ত পতন ঘটবে-তা নির্ধারণ করবে অনাগত মহাকাল।

 

তবে আপাতত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের এই পাল্টাপাল্টি বাগ্‌যুদ্ধ ও কাদা ছোড়াছুড়ি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব শান্তির জন্য মোটেও কোনো ইতিবাচক বা শুভ বার্তা বয়ে আনছে না।

 

- আল জাজিরা