বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেটার সব প্ল্যাটফর্মে নিষিদ্ধ হচ্ছে টিকটকের বিজ্ঞাপন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:১২ পিএম

মেটার সব প্ল্যাটফর্মে নিষিদ্ধ হচ্ছে টিকটকের বিজ্ঞাপন
ছবি : Collected

বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং ব্যবহারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণের তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে একটি যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা।

 

ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী টিকটকের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন নিজেদের প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

ডিজিটাল বিপণন এবং সিলিকন ভ্যালির ব্যবসায়িক সমীকরণে এই সিদ্ধান্তকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ যে এখন প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে, তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ তাদের সাম্প্রতিক এক বিস্তারিত ও গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ওই প্রতিবেদনে মেটার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে যে, প্রযুক্তি বাজারে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে নিজেদেরই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রচারণামূলক সুবিধা বা সেবা প্রদান না করাটা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যুক্তিসঙ্গত একটি ব্যবসায়িক অনুশীলন।

 

নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার যে নিরন্তর সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের অংশ হিসেবেই মেটা অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এই কঠোর বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞার পথে হেঁটেছে।

 

গত বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে টিকটকের মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান, চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট বাইটড্যান্স এবং তাদের সকল বৈশ্বিক অংশীদারের বিজ্ঞাপন ও বিপণন প্রচারণার ওপর এই সম্পূর্ণ এবং নিঃশর্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

 

মেটার পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি বিশ্বব্যাপী তাদের প্রধান বাজারগুলোতে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে।

 

প্রাথমিক পর্যায়ে এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহৎ বাজারগুলোতে কার্যকর করা হয়েছে।

 

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই নিয়ম শুধুমাত্র সরাসরি টিকটকের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে না; বরং যেসব তৃতীয় পক্ষের বিজ্ঞাপনদাতা বা থার্ড পার্টি এজেন্সি টিকটকের সাথে সংযোগ স্থাপনকারী বা টিকটককে লাভবান করে এমন কোনো প্রচারণা চালাবে, তাদের ক্ষেত্রেও এই একই আইনি বিধিনিষেধ অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।

 

এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পেছনের মূল দর্শন এবং ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেটার অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ক্রিস সগ্রো গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিবৃতি প্রদান করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন তাদের নিজেদের পয়সা খরচ করে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে চালানোর কোনো যৌক্তিক বাধ্যবাধকতা মেটার নেই, যাদের মূল ব্যবসায়িক লক্ষ্যই হলো নানা ধরনের চটকদার ভিডিওর মাধ্যমে মেটার ব্যবহারকারীদের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো অ্যাপগুলো থেকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়া।

 

তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে মেটার দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার লড়াই এবং ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সময় বা স্ক্রিন টাইম নিজেদের অনুকূলে রাখার যে মরিয়া প্রচেষ্টা, তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

 

তবে প্রযুক্তি বিশ্বে একে অপরের প্রতি এমন আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। মেটার এই কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে টিকটকের পূর্ববর্তী একটি সিদ্ধান্তও অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

 

এর আগে, টিকটক কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নিজস্ব সিদ্ধান্তে তাদের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের বায়ো বা পরিচিতি অংশে ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুক প্রোফাইলের যেকোনো ধরনের লিংক যুক্ত করার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

 

সেই সময় টিকটকের ওই সিদ্ধান্ত মেটাকে বেশ ক্ষুব্ধ করেছিল। মূলত ব্যবহারকারীদের নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার যে কৌশল বা 'ওয়ালড গার্ডেন' নীতি, প্রযুক্তি জায়ান্টরা এখন একে অপরের বিরুদ্ধে সেটিই অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে ব্যবহার করছে। মেটার বর্তমান পদক্ষেপকে অনেকেই টিকটকের সেই পুরনো নিষেধাজ্ঞার একটি সরাসরি ও অত্যন্ত শক্তিশালী পাল্টা জবাব হিসেবেও বিবেচনা করছেন।

 

বিজ্ঞাপন এবং ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের বাইরে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষা।

 

সম্প্রতি শিশু-কিশোরদের সুরক্ষার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চাপ অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে মেটাকে অনুসরণ করার জন্য টিকটকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপরও আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে।

 

গত অগাস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সাথে মেটা প্রায় এক হাজার আটশো কোটি ডলারের একটি বিশাল এবং ঐতিহাসিক আইনি সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছিল।

 

এই বিশাল অঙ্কের সমঝোতার ফলে মেটা তাদের মালিকানাধীন ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু অত্যাধুনিক এবং কঠোর নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বা ফিচার বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হয়।

 

এই পদক্ষেপ প্রযুক্তি বিশ্বে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন বেঞ্চমার্ক বা মানদণ্ড তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মেটার এই বিপুল অঙ্কের জরিমানা প্রদান এবং নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর বাস্তবায়নের ফলে পুরো প্রযুক্তি শিল্পেই এর একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

 

এর ফলে মেটার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন কোম্পানি, বিশেষ করে টিকটক এবং গুগলের মালিকানাধীন ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবও এখন প্রচণ্ড আইনি চাপের মুখে পড়বে। শিশু-কিশোরদের সুরক্ষার বিষয়ে মেটা যে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে টিকটক এবং ইউটিউবকে তাদের নিজস্ব অ্যাপগুলোর মূল অ্যালগরিদম এবং ব্যবহারকারী ইন্টারফেস নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা জোরালো মত প্রকাশ করেছেন।

 

অন্যথায় তাদেরকেও মেটার মতোই বিশাল অঙ্কের জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। চলতি গ্রীষ্মেই ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকরা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছিলেন যে, তাদের প্ল্যাটফর্মে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ক্ষতিকর আধেয় বা কনটেন্ট থেকে শিশুদের দূরে রাখতে টিকটক এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্ত এবং সন্তোষজনক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ডিজিটাল আইনের অধীনে এই ব্যর্থতার কারণে প্ল্যাটফর্মটিকে তাদের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের ছয় শতাংশ পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের জরিমানা দিতে হতে পারে বলে স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।

 

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এই সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে মেটার গৃহীত সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে অনুসরণ করতে বাধ্য হওয়ায় টিকটক ও ইউটিউব বর্তমানে বেশ কোণঠাসা ও অস্বস্তিকর অবস্থায় পতিত হয়েছে।

 

পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মেটা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ আরও বৃদ্ধি করার কৌশল গ্রহণ করেছে। মেটা সম্প্রতি বিশ্বের প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের সংবাদমাধ্যমে পুরো পাতা জুড়ে বিশাল আকারের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোকেও শিশু সুরক্ষায় একই ধরনের দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে দাবি জানিয়েছে।

 

এর পাশাপাশি, মার্কিন সরকারের উদ্যোগে স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ এবং শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি নীতিনির্ধারণী বৈঠকে টিকটকের শীর্ষ কর্তাদের উপস্থিত থাকতে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাটিকে মেটা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে।

 

মেটা অভিযোগ করেছে যে, টিকটক মুখে শিশু সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে, মেটার এই ধারাবাহিক আক্রমণ, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখেও টিকটক কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে খুব একটা মুখ খোলেনি।

 

বর্তমানে ল্যারি এলিসনের নেতৃত্বাধীন ওরাকল কর্পোরেশনসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একদল অত্যন্ত প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীর আংশিক মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

 

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং প্রযুক্তিগত দ্বন্দ্বের এই অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল সময়ে টিকটক তাদের পরবর্তী কৌশলগত পদক্ষেপ কী নেয় এবং মেটার এই বিশাল ও বহুমুখী আক্রমণ কীভাবে প্রতিহত করে, এখন সেদিকেই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে সমগ্র বিশ্বের প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মহল।

 

- সংবাদ মাধ্যম