শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের এক বছর” হাসিনার পতন, নতুন বাংলাদেশের উত্থান 

RNS News

মো. মেহেদি হাসান, আর এন এস নিউজ

প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৫, ০৮:০৮ পিএম

“সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের এক বছর” হাসিনার পতন, নতুন বাংলাদেশের উত্থান 
ছবি : ঢাকা পোষ্ট

২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত জুলাইয়ের কথা মনে এলেই গা শিউরে ওঠে। ইতিহাসে কিছু মাস কেবল তারিখ হয়ে থাকে না, বরং মানুষের কান্না, স্বপ্ন ও প্রতিবাদের উত্তাল গর্জনকে ধারণ করে। আর ২০২৪ সালের জুলাই তা তো জাতির ইতিহাস বদলে দেওয়া এক বৈপ্লবিক মুহূর্ত। সেই সময় শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়েছিলেন, আর আজ, এক বছর পর, আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক নতুন বাংলাদেশের বুকে যেখানে গণতন্ত্র আছে, স্বাধীন মতপ্রকাশ আছে, আর আছে আগামী দিনের জন্য এক সাহসী প্রত্যয়।

 

“জুলাই ২০২৪” আগুনের রাত, প্রতিরোধের সকাল :

শুরুটা হয়েছিল অত্যন্ত ন্যায়সংগত এক দাবিকে ঘিরে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে। যুগে যুগে ছাত্রসমাজই জাতির বিবেক, এবং এবারও তারা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে এগিয়ে আসে। কিন্তু এর জবাবে তারা পায় গুলি, লাঠিপেটা আর চোখের জল।

 

শুধুমাত্র ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতেও ছাত্রছাত্রীরা এক সুরে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সেই প্রতিরোধকে দমন করতে সরকার যেভাবে সেনা নামায়, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং নিরীহ ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করে—তা দেখে গোটা জাতি বিস্মিত হয়ে যায়। রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর এবং শহরের অলিগলি রক্তে রঞ্জিত হয়। তবে ছাত্রসমাজ থেমে থাকেনি। বরং এই রক্তই হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহের ইন্ধন।

 

শেখ হাসিনার পতন  পালানোর নেপথ্য কাহিনি :

সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কিছু অংশ যখন ছাত্রদের দমনে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখনই রাষ্ট্রযন্ত্রে ফাটল ধরে। একদিকে ছাত্রসমাজ, অন্যদিকে সাধারণ জনগণ সবাই যখন রাজপথে, তখন দেশের অনেক উচ্চপদস্থ আমলাও সরকারের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ঠিক সেই সময়ে, ২৫শে জুলাই গভীর রাতে, শেখ হাসিনা একটি সামরিক বিমানে করে দেশ ছাড়েন। উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ভারত।

 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পরবর্তী অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ভারতের একটি সামরিক ঘাঁটিতে তাকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হয়। তার এই পালিয়ে যাওয়া কেবল একটি ব্যক্তির ক্ষমতার অবসান ছিল না, বরং একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি। এক বছর পর আজ আমরা বলতেই পারি জুলাই ছিল মুক্তির সূচনা।

 

নতুন বাংলাদেশ এক বছরের অর্জন :

২০২৫ সালের আগস্টে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ এক নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। রাজপথের সেই আন্দোলন কেবল একটি সরকার পতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিষ্ঠা। নতুন সংবিধান প্রণয়ন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন এবং ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন, সব মিলিয়ে এই সময়টুকু যেন এক নবজন্মের অনুরণন।

 

আজকের বাংলাদেশে সরকারি চাকরির নিয়োগে শতভাগ মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু হয়েছে, যেখানে মতপ্রকাশ ও বিরোধিতার জন্য কাউকে আর কারাগারে যেতে হয় না। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন মিডিয়া সবখানেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরেছে। এমনকি 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন' বাতিল করে একটি নতুন গণমাধ্যম আইন পাস হয়েছে, যা মুক্ত মতপ্রকাশকে সুরক্ষা দেয়।

 

নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক অবস্থান :

২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণভাবে ছাত্রনেতৃত্বাধীন। আজ সেই নেতারাই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শিক্ষানীতির রূপকার, জনপ্রশাসনের সংস্কারক, মানবাধিকার কমিশনের প্রধান। তারা লাঠি নয়, কলম হাতে নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের কণ্ঠে রয়েছে সেই চেতনার ধ্বনি, যা বলেছিল, "আমরা কেউই শাসক হতে চাই না, আমরা চাই শাসনব্যবস্থা বদলাতে।

 

এই নতুন প্রজন্মের সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী। রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্যোগ ও জনসম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতি রক্ষায় ঢাকায় 'জুলাই স্মৃতি জাদুঘর' স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আন্দোলনের ছবি, ব্যানার, পোস্টার এবং শহীদদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে।

 

আন্তর্জাতিক মহলে শেখ হাসিনার সরকারের সময় বাংলাদেশ যেখানে নজরদারির দেশ ছিল, সেখানে এখন বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুপ্রেরণা। জাতিসংঘে নতুন নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং প্রতিবেশী ভারত ও চীন, সবাই এই নতুন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বদলে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারছেন, "আজ আমরা সত্যিই স্বাধীন।

 

ভুলে যাওয়া নয়, শিক্ষা গ্রহণ :

তবে এই বিজয় যেন আত্মতুষ্টি না হয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই জুলাই মাস একটি বড় শিক্ষা, যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত, অহংকার আর দমননীতি কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই প্রতি বছর ২৫শে জুলাইকে 'গণতন্ত্র দিবস' হিসেবে পালন করা হয়। স্কুল-কলেজে পড়ানো হয় সেই ইতিহাস, যেন আর কোনো সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে।

 

এক বছর আগে আমরা ছিলাম আতঙ্কে, ঘৃণায় আর শোকে ভরপুর। আজ আমরা আশায়, আত্মবিশ্বাসে এবং স্বপ্নে ভরপুর। জুলাই ছিল বিদ্রোহের মাস, আগস্ট ছিল উত্তরণের আর আজকের বাংলাদেশ হলো প্রত্যয়ের। শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ও তার পালিয়ে যাওয়া কেবল একটি ঘটনার নাম নয়, এটি ছিল নতুন ইতিহাসের সূচনা। 'নতুন বাংলাদেশ' আর কোনো স্লোগান নয় এটি এখন বাস্তবতা। এক বছর পেরিয়ে আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি হ্যাঁ, আমরা পেরেছি। আমরা নতুন ইতিহাস লিখেছি, নিজেদের রক্তে, সাহসে আর বিশ্বাসে।

 

 এমএইচ