কোরীয় উপদ্বীপে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে দ্রুত পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফরকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শি জিনপিংয়ের বিদেশ সফরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে বিশ্বনেতারাই বেইজিংয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর মধ্যে তাঁর এই পিয়ংইয়ং যাত্রা প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের কাছে এই সফরের কৌশলগত গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বছরে গড়ে চৌদ্দটি বিদেশ সফর করলেও ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা নেমে আসে মাত্র ছয়টিতে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শি জিনপিংয়ের এই আকস্মিক সফরের মূল কারণ হলো রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বেইজিংয়ের গভীর উদ্বেগ। ঐতিহ্যগতভাবে চীন এবং উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কে বেইজিং সব সময়ই প্রধান অংশীদার বা 'বড় ভাই'-এর ভূমিকা পালন করে আসছে।
পিয়ংইয়ংয়ের মোট বাণিজ্যের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশই চীনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর থেকে এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর সামরিক সরবরাহ সচল রাখতে উত্তর কোরিয়া ব্যাপকভাবে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্য পাঠাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি-এর তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে সৈন্য ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিনিময়ে রাশিয়া পিয়ংইয়ংয়কে প্রায় চৌদ্দ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এর একটি বড় অংশই নজরদারি এড়িয়ে গোপন সামরিক প্রযুক্তি ও নির্ভুল যন্ত্রাংশ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার হাতে পৌঁছেছে। দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক গবেষক লি সাং ইয়ং মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে চীন যথেষ্ট সতর্ক।
পিয়ংইয়ং যেন পুরোপুরি মস্কোর দিকে ঝুঁকে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে চীন নিজস্ব প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। এই লক্ষ্য পূরণে চীন হয়তো উত্তর কোরিয়াকে নতুন করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্রস্তাব দিতে পারে।
অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং জানান, বেইজিং সব সময়ই পিয়ংইয়ংকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত থেকেছে। কারণ, উত্তর কোরিয়া সামরিকভাবে অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠলে তা কোরীয় উপদ্বীপের স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
অথচ চলতি বছরের শুরু থেকেই উত্তর কোরিয়া অন্তত আটটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে এনেছে। এমনকি সম্প্রতি কিম জং উন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান উৎপাদনকারী একটি কারখানাও পরিদর্শন করেছেন।
কোরীয় উপদ্বীপের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া চীনের এই কূটনৈতিক সফরকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে। সিউলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে, শি জিনপিংয়ের এই সফর ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।
এছাড়া, এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক চুক্তির খবরও বেইজিংকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে বাধ্য করছে।
সার্বিক বিবেচনায়, কিম জং উনের ওপর রাশিয়ার ছায়া নিয়ন্ত্রণ করা এবং পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখাই চীনা প্রেসিডেন্টের এই ঐতিহাসিক সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।