হাওড়ার শ্যামপুর এলাকায় রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের ওই নেতাকে জনসমক্ষে জুতার মালা পরিয়ে এবং মাথার চুল কেটে দিয়ে পুরো গ্রাম ঘোরানোর মতো এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে।
সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং তার এমন অভাবনীয় বহিঃপ্রকাশ স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চরম হেনস্থার শিকার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম সন্ন্যাসী মান্না। তিনি হাওড়া জেলার শ্যামপুর এলাকার আমড়দহ গ্রাম পঞ্চায়েতের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এই নেতা গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ প্রকল্প, সরকারি আবাসন সুবিধাসহ সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক সেবার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও আর্থিক শোষণের শিকার হয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত চরমে পৌঁছায়। সম্প্রতি সেই ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে। একদল উত্তেজিত জনতা ওই নেতার বাসভবনে চড়াও হন এবং তাকে জোরপূর্বক বাড়ির বাইরে বের করে আনেন।
এরপর জনসমক্ষে তাকে চরম অপদস্থ করা হয়। বিক্ষুব্ধ লোকজন জনসমক্ষে তার মাথার চুল কেটে দেন এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে ও কোমরে শক্ত দড়ি বেঁধে তাকে নিয়ে পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ করেন।
জনরোষের এই বিরল ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা খুব দ্রুতই উপস্থিত মানুষের মাধ্যমে ভিডিওচিত্র হিসেবে ধারণ করা হয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই তা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা বর্তমানে গোটা রাজ্যজুড়ে মূল আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, এমন চরম অপদস্থ ও হেনস্থার শিকার হওয়ার পর অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা সন্ন্যাসী মান্না গণমাধ্যমের কাছে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেননি।
বরং তিনি আংশিক সত্যতা স্বীকার করে দাবি করেছেন যে, ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, এলাকার কিছু স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজের জন্যই নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি সামান্য কিছু অর্থ গ্রহণ করেছিলেন।
পাশাপাশি, তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে সেই গৃহীত অর্থ দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত মালিকদের কাছে নির্দ্বিধায় ফেরত দিতেও নিজের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
এলাকায় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির খবর পেয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং উত্তেজিত জনতার রোষানল থেকে অভিযুক্ত ওই নেতাকে উদ্ধার করে পরিস্থিতি নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেন।
এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে পুলিশ সন্ন্যাসী মান্নাকে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নিজস্ব হেফাজতে নেয় এবং তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
একই সঙ্গে, ওই নেতার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা, সাধারণ মানুষের জনরোষের মূল কারণ এবং প্রকাশ্যে আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে শৃঙ্খলা ভঙ্গের পুরো ঘটনাটির বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।