সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা পার্টি’ নামের এই কাল্পনিক রাজনৈতিক দলটির অনুসারীর সংখ্যা মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে দুই কোটি বিশ লাখ ছাড়িয়েছে।
বিস্ময়করভাবে এই বিপুল জনসমর্থন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আনুষ্ঠানিক অনুসারীর সংখ্যার চেয়েও দ্বিগুণের বেশি। ব্যতিক্রমী এই প্রতিবাদের সূত্রপাত হয় গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একটি মামলার শুনানিকালে বেকার তরুণদের তিনি ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন বলে সামাজিক মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও পরে তিনি দাবি করেন যে তাঁর বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, ততক্ষণে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধে। এই অপমানজনক মন্তব্যকে পুঁজি করে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আত্মপ্রকাশ ঘটান।
অলস, বেকার ও অবহেলিত তরুণদের একমাত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে দাবি করা এই উদ্যোগ মুহূর্তেই অন্তর্জালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। অন্তর্জালের গণ্ডি পেরিয়ে এই ক্ষোভ এখন আছড়ে পড়েছে দিল্লির রাজপথে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে এক বিশাল যুব সমাবেশের ডাক দেন। দেশটিতে সম্প্রতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে আয়োজিত এই বিক্ষোভে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
মাথায় তেলাপোকার মুখোশ এবং হাতে ‘আমিই তেলাপোকা’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ তরুণ এই সমাবেশে অংশ নেন, যা মোদি সরকারের জন্য রাজপথের এক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, অথচ প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতাদের গড় বয়স ষাট থেকে সত্তরের কোঠায়।
এই জনমিতিক ব্যবধান তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের এক বড় মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছানোর পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা তাদের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ ও নেপালে তরুণদের সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক আন্দোলনগুলো যেভাবে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে, বিশ্লেষকরা তেলাপোকা পার্টির এই উত্থানকেও সেই সমীকরণে মেলাচ্ছেন।
অহিংস এই আন্দোলন এরই মধ্যে বিভিন্ন বিরোধী দলের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। শুরুতে ক্ষমতাসীন বিজেপি বিষয়টিকে নিছক অন্তর্জালের চমক বা বিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিলেও, রাজপথে তরুণদের এই অভাবনীয় গর্জন মোদি সরকারের দীর্ঘ এক যুগের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।