পশ্চিম উত্তর প্রদেশের বিজনোরে আয়োজিত একটি বিশাল ও জনাকীর্ণ জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই দুর্নীতির ঘটনা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের দ্বিমুখী ভূমিকার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ওয়াইসি অভিযোগ করেন যে, এই চুরির ঘটনায় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ এবং তারা অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপট টেনে তিনি উত্তর প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম বৈষম্যমূলক আচরণের কঠোর সমালোচনা করেন।
জনসভায় উপস্থিত হাজারো সমর্থকের উদ্দেশে দেওয়া ওই সুনির্দিষ্ট বক্তব্যে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি দাবি করেন, রাম মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের ভেতর যদি কোনো মুসলিম সদস্য জড়িত থাকতেন, তবে এতক্ষণে রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসন তাকে বিনা বিচারে ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করত।
শুধু তা-ই নয়, কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে অভিযুক্তের পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই তথা বসতবাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হতো। তিনি আরও বলেন যে, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি মুসলিম হতেন, তবে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং তার ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মামলার ইতি টেনে দিত।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী অভিযুক্তরা রাজসাক্ষী বা প্রশাসনের নাকের ডগায় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যা দেশটির বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাম মন্দিরের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢিলেঢালা পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে হায়দরাবাদের এই সংসদ সদস্য বলেন, মামলার প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
এমনকি উত্তর প্রদেশ পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করার ন্যূনতম কোনো উদ্যোগও প্রদর্শন করছে না। ওয়াইসির এই তীক্ষ্ণ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পর জনসভায় উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থকের মধ্যে জোরালো করতালি ও উল্লাস দেখা যায়, যা বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর প্রদেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ওয়াইসির এই বক্তব্য রাজ্যের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই দুর্নীতির অভিযোগের একটি ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা ভারতের সামগ্রিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বর্তমানে যে বিশাল রাম মন্দির গড়ে উঠেছে, সেই বিতর্কিত স্থানেই একসময় দাঁড়িয়ে ছিল ষোড়শ শতকে মোঘল আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ।
১৯৯২ সালে উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর হামলায় মসজিদটি ভেঙে ফেলার পর সমগ্র ভারতজুড়ে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ঐতিহাসিক দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিক।
এরপর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ওই স্থানেই রাম মন্দির নির্মাণের আইনি পথ সুগম হয় এবং আড়াই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং এই মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন।
ধর্মীয় আবেগ, বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই মন্দিরটি এখন অর্থ ও মূল্যবান উপহার আত্মসাতের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
গত এক মাস ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে যে, সাধারণ ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার অনুদান ও মূল্যবান সামগ্রী ট্রাস্টের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় পুলিশ নামমাত্র তদন্ত শুরু করেছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজন নিম্নপর্যায়ের ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল চক্রটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
এই জঘন্য চুরির ঘটনায় সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ভক্তদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ব্রজেশ কুমার নামের একজন সাধারণ ভক্ত আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, কোটি কোটি মানুষের পবিত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে চরম প্রতারণা করা হয়েছে।
যারা ধর্মের নামে সাধারণ মানুষের অগাধ আস্থা ও সরলতাকে পুঁজি করে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, তাদের কোনোভাবেই ক্ষমা করা যায় না। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, রাম মন্দিরের মতো একটি স্পর্শকাতর ও জাতীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এমন দুর্নীতির অভিযোগ ভারতের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।