শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতির অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক নৌবাহিনী প্রধান গ্রেপ্তার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

দুর্নীতির অভিযোগে শ্রীলঙ্কার সাবেক নৌবাহিনী প্রধান গ্রেপ্তার
ছবি : Collected

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার রাজনীতি, সামরিক অঙ্গন ও বিচার ব্যবস্থায় আবারও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতা এবং দুর্নীতির চরম অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে দেশটির সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ফ্লিট অ্যাডমিরাল ওয়াসান্থা কারান্নাগোদাকে গ্রেপ্তার করেছে শ্রীলঙ্কার স্বাধীন ঘুষ ও দুর্নীতি দমন কমিশন।

 

শুক্রবার, ৩ জুলাই, রাজধানী কলম্বো থেকে তিয়াত্তর বছর বয়সী এই সাবেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে আনুষ্ঠানিক হেফাজতে নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

 

মূলত শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের ছেলে যোশিথা রাজাপাকসকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং যথাযথ যোগ্যতা ছাড়াই নৌবাহিনীতে নিয়োগ প্রদানে অবৈধ ও অনৈতিক সহায়তা করার জন্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

 

এই ঘটনাটি দেশটির সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে সংঘটিত দুর্নীতি ও নগ্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের একটি বড় প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে। ঘুষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে যোশিথা রাজাপাকসকে সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

 

সেই সময় কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা, মেধা বা সামরিক বিধিমালার তোয়াক্কা না করে তাকে সরাসরি এই গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদে বসানো হয়। শুধু নিয়োগ দিয়েই ক্ষান্ত হননি কারান্নাগোদা, সরকারি কোষাগারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যোশিথার জন্য বিদেশে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণেরও বিশেষ ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।

 

গত মাসে যোশিথা রাজাপাকসেকেও সরকারি তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ করে যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথ নৌ কলেজে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুস্পষ্ট অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তিনি আদালতের মাধ্যমে সাময়িক জামিন লাভ করে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন, তবে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া এবং সম্পদের প্রকৃত উৎস গোপনের অভিযোগে একটি বড় ধরনের ফৌজদারি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

 

গ্রেপ্তারকৃত ফ্লিট অ্যাডমিরাল ওয়াসান্থা কারান্নাগোদা শ্রীলঙ্কার সামরিক ইতিহাসে একজন অত্যন্ত পরিচিত এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ২০০৯ সালে দীর্ঘ আড়াই দশকের রক্তক্ষয়ী তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের একেবারে চূড়ান্ত ও শীর্ষ পর্যায়ে তিনি শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

 

তামিল টাইগার বা এলটিটিই বিদ্রোহীদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী যে কঠোর কৌশল গ্রহণ করেছিল, তার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন তিনি। যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি একসময় জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, সময়ের সাথে সাথে তার নামের সাথে যুক্ত হতে থাকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নির্মমতার একাধিক গুরুতর অভিযোগ।

 

বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছিলেন, তবে অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে বারবার আইনি ও আন্তর্জাতিক জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। দুর্নীতির এই সাম্প্রতিক অভিযোগের বাইরেও কারান্নাগোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে রাজধানী কলম্বো এবং এর আশপাশের এলাকা থেকে এগারোজন নিরপরাধ তরুণকে জোরপূর্বক অপহরণ ও পরবর্তীতে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো।

 

দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাবে স্থগিত থাকার পর, ওই তরুণদের হত্যার ষড়যন্ত্রের মামলাটি সম্প্রতি নতুন করে আইনি প্রক্রিয়ায় পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে গত ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য সরকার এই সাবেক নৌবাহিনীর প্রধানের ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দীর্ঘ সময় ধরে তার বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে। শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

গত ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটিতে দুর্নীতিবিরোধী এক কঠোর ও আপসহীন অভিযান শুরু হয়েছে।

 

বিগত কয়েক দশক ধরে শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রতাপশালী রাজাপাকসে পরিবার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক মিত্রদের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির পুরোনো ও আলোচিত মামলাগুলো বর্তমান সরকারের আমলে নতুন করে অভূতপূর্ব গতি পেয়েছে।

 

চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সুষ্ঠু বিচার চেয়ে আসছিলেন। বর্তমান প্রশাসন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কারান্নাগোদার মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তার একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান ও ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটছে।

 

পরিশেষে বলা যায়, সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ওয়াসান্থা কারান্নাগোদার এই গ্রেপ্তার কেবল একটি সাধারণ আইনি বা দাপ্তরিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের ও সাহসী আঘাত।

 

একসময় যারা ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করে নিজেদের চিরকাল আইনের ঊর্ধ্বে বলে মনে করতেন, আজ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হচ্ছে।

 

রাজাপাকসে পরিবারের ঘনিষ্ঠ এই প্রবীণ সামরিক কর্মকর্তার বিচার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কীভাবে সম্পন্ন হয় এবং এর ফলে দেশটির ভবিষ্যৎ সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতি রোধে আরও কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে শ্রীলঙ্কার আপামর জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

 

- বিএসএস