নিজের দাপ্তরিক ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে ঘটনার পুরো চিত্র তুলে ধরেছেন স্বয়ং মহুয়া মৈত্র। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থান করছেন এবং বাইরে থেকে একদল ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে অনবরত ডিম নিক্ষেপ করছে।
লাইভ চলাকালীন মহুয়া মৈত্রের কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা ফুটে উঠেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে এক চরম অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে একজন নির্বাচিত নারী সাংসদও উগ্র জনতার হাত থেকে নিরাপদ নন।
নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে মহুয়া মৈত্র আক্ষেপের সুরে বলেছেন, একজন নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধির নিরাপত্তা যদি এমন নাজুক অবস্থায় থাকে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অবস্থা কতটা শোচনীয় হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঘটনাস্থলে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তারা হামলাকারীদের থামাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, যা অত্যন্ত বিস্ময়কর ও উদ্বেগের। একজন সাংসদের ওপর এ ধরনের প্রকাশ্য হামলার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, এই হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিজেপি নেতা অর্জুন সিংয়ের মন্তব্য বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। ডিম নিক্ষেপের মতো সহিংস ঘটনাকে এক প্রকার বৈধতা দিয়ে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের অতীতের সহিংসতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে যেখানে বোমা ও গুলির শব্দ শোনা যেত, বর্তমানে তার বদলে এসেছে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা।
তিনি আরও বলেন, ভারতের নতুন আইনে ডিম নিক্ষেপের নির্দিষ্ট কোনো শাস্তির উল্লেখ নেই। তবে আগে যারা পাথর ও বোমা ছুড়তেন, তারা এখন ডিমকেই বেশি ভয় পাচ্ছেন। এমন মন্তব্য করার পাশাপাশি তিনি অবশ্য ভবিষ্যতে এ ধরনের ডিম নিক্ষেপের সমাপ্তি ঘটানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
একজন দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মুখ থেকে এমন মন্তব্য রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এদিকে, এই ঘটনার দায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গ শাখা। দলটির রাজ্য প্রধান শমীক ভট্টাচার্য গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, মহুয়া মৈত্রের ওপর হামলার ঘটনাটি সাজানো।
তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরাই নিজেরাই এই ঘটনার পরিকল্পনা করেছেন এবং তারাই তাদের সাংসদকে হেনস্তা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। বিজেপির পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মহুয়া মৈত্রের ফেসবুক লাইভ এবং তার পরপরই বিভিন্ন মহলের বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্রটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে একজন সাংসদের নিরাপত্তা ও তার প্রতি উগ্রবাদী আচরণের বিষয়টি যেমন গুরুত্ব পাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বিতর্কিত মন্তব্য ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। একজন জনপ্রতিনিধির ওপর প্রকাশ্যে এমন হামলার ঘটনা যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এক প্রকার আঘাত, তা নিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির বর্তমান এই অস্থিরতা কবে নাগাদ স্তিমিত হবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। ঘটনাটির তদন্ত এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংসদ ও তার দল। তবে রাজনৈতিক দোষারোপের এই খেলায় প্রকৃত সত্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।