শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেকর্ড আয়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রেকর্ড আয়
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা সংক্রান্ত ব্যবসা থেকে বিপুল আয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশিত প্রেসিডেন্টদের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রিপ্টো সংক্রান্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাত থেকে একশো কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি আয় করেছেন।

 

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ৯২৭ পৃষ্ঠার এই বিস্তারিত ও সুদীর্ঘ প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক আয়ের এই খতিয়ান তুলে ধরা হয়, যা মার্কিন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

প্রতিবেদনে প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিপুল আয়ের একটি বড় অংশ এসেছে রয়্যালটি বাবদ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক কয়েকদিন পূর্বে বাজারে আসা ‘ট্রাম্প মিম কয়েন’ নামক ডিজিটাল মুদ্রা থেকে তিনি রয়্যালটি হিসেবে প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করেছেন।

 

যদিও বাজারে ছাড়ার পর এই নির্দিষ্ট কয়েনটির মূল্যমান পরবর্তীতে অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে, তবুও এর প্রাথমিক বাণিজ্যিক সাফল্য ট্রাম্পের ব্যক্তিগত তহবিলে বিশাল অঙ্কের জোগান দিয়েছে।

 

এর পাশাপাশি, ট্রাম্পের পুত্র এবং তার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সহযোগী স্টিভ উইটকফের সন্তানদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ থেকেও তার আয় হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।

 

এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি মুনাফা অর্জন করেছেন, যা তার সামগ্রিক আয়ের পাল্লাকে অনেক ভারী করেছে। ডিজিটাল মুদ্রার এই বিশাল আয়ের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সনাতনী রিয়েল এস্টেট ব্যবসা এবং ট্রাম্প ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্য থেকেও লাখ লাখ ডলারের রয়্যালটি ও মুনাফা অর্জিত হয়েছে।

 

তবে প্রেসিডেন্টের এই বাণিজ্যিক আয় এবং সরকারি পদের কারণে কোনো ধরনের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এর জবাবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে জানানো হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প কোনোভাবেই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন না।

 

প্রশাসনের দাবি, ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বেই ট্রাম্প তার যাবতীয় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা নিজের সন্তানদের পরিচালিত একটি স্বাধীন ট্রাস্টের হাতে হস্তান্তর করেছেন। ফলে এখানে স্বার্থের সংঘাতের কোনো সুযোগই নেই।

 

হোয়াইট হাউসের উপ-প্রেস সচিব আনা কেলি এক বিবৃতিতে জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট গর্বের সাথে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রধান রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছেন। তিনি এবং তার পরিবার কখনোই কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাতে জড়াননি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবেন না।

 

তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রেসিডেন্টের গৃহীত সমস্ত সিদ্ধান্ত কেবল আমেরিকান জনগণের বৃহত্তর কল্যাণেই নেওয়া হয়ে থাকে। রাজনৈতিক বিরোধীদের এই সংক্রান্ত সমালোচনাকে তিনি ডেমোক্র্যাট দল এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অসত্য প্রচারণা বলে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মোট ঘোষিত আয় ছিল ৬০ কোটি ডলারের কিছু বেশি, যা ২০২৫ সালে এসে এক লাফে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মূল রিয়েল এস্টেট বা আবাসন ব্যবসার আয়কেও এবার ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের আয় ছাড়িয়ে গেছে।

 

তবে তার বিভিন্ন বিলাসবহুল গল্ফ ক্লাব থেকেও এবার উল্লেখযোগ্য অঙ্কের রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে তার মালিকানাধীন মার-এ-লাগো ক্লাব থেকে প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং ফ্লোরিডার ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরাল মিয়ামি গলফ ক্লাব থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় হয়েছে।

 

এছাড়া অন্যান্য গল্ফ রিসোর্ট ও ক্লাব থেকেও কয়েক কোটি ডলারের রাজস্ব এসেছে। ট্রাম্প ব্র্যান্ডের বিশেষ সংস্করণের হাতঘড়ি থেকে রয়্যালটি বাবদ অর্জিত হয়েছে ৪৭ লাখ ডলার। এর বাইরে তার নামাঙ্কিত বিশেষ বাইবেল, জুতো, সুগন্ধি এবং গিটারের মতো বিবিধ স্মারক পণ্য থেকেও বিপুল অঙ্কের মুনাফা এসেছে।

 

একই প্রতিবেদনে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের আয়ের বিবরণও আলাদাভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। মেলানিয়া ট্রাম্পের জীবনের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের লাইসেন্স বা প্রচার স্বত্ব চুক্তি থেকে তিনি ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছেন।

 

পাশাপাশি, তার নিজস্ব ডিজিটাল শিল্পকর্ম বা নন-ফাঞ্জিবল টোকেন বিক্রি থেকেও প্রায় ৬০ লাখ ডলারের অতিরিক্ত আয় অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন মার্কিন মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের করা আইনি মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প এককালীন ৮ কোটি ৬৫ লাখ ডলার লাভ করেছেন।

 

এই অর্থের উৎস হিসেবে এবিসি, সিবিএস, মেটা, ইউটিউব এবং এক্স এর মতো প্রভাবশালী মাধ্যমগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে যে, আইনি লড়াই থেকে প্রাপ্ত এই বিশাল অর্থের সিংহভাগই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি এবং মেমোরিয়াল পার্কের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হবে।

 

বিশ্বখ্যাত আর্থিক সাময়িকী ফোর্বসের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুসারে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ২৩৩ কোটি ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ব্লুমবার্গের নিজস্ব সূচক অনুযায়ী এই সম্পদের পরিমাণ আরও বেশি, যা প্রায় ৭৬০ কোটি ডলার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরুত্থানের পর তার প্রশাসন ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের প্রতি অত্যন্ত নমনীয় ও সহায়তাকর নীতি গ্রহণ করেছে।

 

তিনি এই খাতের প্রবক্তা ও সমর্থকদের প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। যার ফলে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পূর্ববর্তী কঠোর নিয়মকানুনও ক্রিপ্টো ব্যবসার অনুকূলে অনেক শিথিল করা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ৯০০ পৃষ্ঠারও বেশি দীর্ঘ এই বিশদ আর্থিক প্রতিবেদনটি ট্রাম্পের পূর্বসূরি জো বাইডেনের শেষ বছরের মাত্র ১১ পৃষ্ঠার সাধারণ প্রতিবেদনের তুলনায় বহুগুণ বড়, যা ট্রাম্প সাম্রাজ্যের বিশালতা ও বৈচিত্র্যময় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

 

- বিবিসি