বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থাইল্যান্ডে শিশুর চালানো পিকআপ চাপায় নিহত আট সন্ন্যাসী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

থাইল্যান্ডে শিশুর চালানো পিকআপ চাপায় নিহত আট সন্ন্যাসী
ছবি : Collected

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মুকদাহান প্রদেশে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার ভোরে একটি ধর্মীয় পদযাত্রা চলাকালে একটি পিকআপ ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পুণ্যার্থীদের ওপর উঠে গেলে এই ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাটি ঘটে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা, কারণ ঘাতক যানটি চালাচ্ছিল মাত্র ১১ বছর বয়সী এক অপরিণত শিশু। এই অপ্রত্যাশিত ও মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের পাশাপাশি আরও অন্তত ২০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।

 

স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন এবং এই হতাহতের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যমতে, থাইল্যান্ডের গ্রামীণ সড়কের পাশ ধরে একটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রার অংশ হিসেবে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন একদল পুণ্যার্থী।

 

এই সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় শোভাযাত্রায় মোট ৩৫ জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং তাদের অনুসারী হিসেবে আরও পাঁচজন সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে তারা যখন তাদের নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগতির পিকআপ ট্রাক তাদের ওপর আছড়ে পড়ে।

 

শান্ত ও নীরব পরিবেশে হঠাৎ করেই নেমে আসে মৃত্যুর বিভীষিকা। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দ ও ভক্তির পরিবেশ পরিণত হয় এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে, যেখানে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় হতাহত সন্ন্যাসীদের।

 

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শী সন্ন্যাসী ফ্রা সোমপং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, তারা যখন সড়কের একপাশ দিয়ে অত্যন্ত শৃঙ্খলার সাথে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ তিনি দূর থেকে একটি পিকআপ ট্রাককে অত্যন্ত অস্বাভাবিক গতিতে তাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখেন।

 

আসন্ন বিপদের আঁচ পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করে ‘বুদ্ধো, বুদ্ধো’ মন্ত্র জপ করতে শুরু করেন। চোখের পলকেই ঘাতক ট্রাকটি তাদের শোভাযাত্রার ওপর উঠে যায়। ফ্রা সোমপং অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ভাগ্যক্রমে তিনি এবং তার পাশের আরেকজন সন্ন্যাসী শেষ মুহূর্তে লাফ দিয়ে রাস্তার পাশে সরে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে গেছেন।

 

কিন্তু তাদের পেছনে থাকা অন্যান্য সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থীরা ট্রাকটির সজোরে ধাক্কায় ছিটকে পড়েন এবং মুহূর্তের মধ্যে মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হন। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় জনতা ও উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

 

পুলিশের প্রাথমিক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ট্রাকের ভয়াবহ ও সরাসরি আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন সন্ন্যাসীর করুণ মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে গুরুতর আহত অবস্থায় বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজন সন্ন্যাসী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

 

সব মিলিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোট আটজন সন্ন্যাসী প্রাণ হারান। আহত অন্যান্য ২০ জনেরও বেশি মানুষের চিকিৎসা এখনো চলছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। ফলে নিহতের সংখ্যা সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ খুঁজতে গিয়ে থাইল্যান্ডের পুলিশ এক চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য উদ্ঘাটন করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঘাতক পিকআপ ট্রাকটির চালকের আসনে ছিল মাত্র ১১ বছর বয়সী এক অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।

 

সে তার বাবা-মায়ের অগোচরে তাদের পারিবারিক গাড়িটি নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছিল। এত অল্প বয়সী একজন শিশুর হাতে কীভাবে একটি ভারী গাড়ির নিয়ন্ত্রণ গেল এবং এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে গাড়ির মালিক হিসেবে তার অভিভাবক বা বাবা-মায়ের কতটা গাফিলতি ছিল, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি থাইল্যান্ডের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং শিশুদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়ার মারাত্মক আইনি ও সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে নতুন করে দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

পুরো মুকদাহান প্রদেশ জুড়ে এখন বইছে শোকের মাতম, আর এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুগুলো গোটা দেশের সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে। ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

 

- আমার দেশ