গত মে মাসে হাইকোর্টের জারি করা এই বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞা রাজ্যটির বিদ্যমান আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করছে রাজ্য প্রশাসন। বুধবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে শীর্ষ আদালতে একটি স্পেশাল লিভ পিটিশন দাখিল করেছে, যেখানে হাইকোর্টের রায়ের আইনি অসংগতি ও এখতিয়ারগত ত্রুটিগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ২৭ মে, যখন মাদ্রাজ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্যজুড়ে গরু ও বাছুর জবাইয়ের ওপর তাৎক্ষণিক এবং পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন ও বিচারপতি ভি লক্ষ্মীনারায়ণের বেঞ্চ তাদের আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, যেকোনো ধরনের পশু জবাই শুধুমাত্র অনুমোদিত কসাইখানাতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
একইসঙ্গে, ঈদুল আজহাসহ ধর্মীয় বা অন্য যেকোনো উৎসবের দিনে প্রকাশ্যে গরু ও বাছুর জবাই প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজ্যের মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়।
কট্টরপন্থি রাজনৈতিক দল ‘ইন্দু মাক্কাল কাচ্চি’র সাধারণ সম্পাদক সূর্যের দায়ের করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন, যেখানে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে পশু জবাই বন্ধের দাবি জানানো হয়েছিল।
তবে হাইকোর্টের এই রায়কে তামিলনাড়ুর প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোর জন্য বড় ধরনের বাধা হিসেবে দেখছে থালাপতি বিজয়ের সরকার। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা পিটিশনে রাজ্য সরকার যুক্তি দিয়েছে যে, মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশটি মূলত ‘তামিলনাড়ু পশু সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৮’-এর মৌলিক চেতনার পরিপন্থি।
বিদ্যমান এই আইনে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে গরু বা বাছুর জবাইয়ের আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে, যে সকল গরু বয়সের ভারে বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে কৃষিকাজ ও প্রজননের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমতি সাপেক্ষে সেগুলোর ক্ষেত্রে জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়।
রাজ্য সরকারের অভিযোগ, হাইকোর্টের এই নিষেধাজ্ঞা বর্তমান আইনসভার পাশ করা আইনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং আদালত তার সাংবিধানিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সরাসরি আইনসভার কাজে হস্তক্ষেপ করেছে।
পিটিশনে আরও বলা হয়েছে, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ১৯৭৬ সালে জারি করা সরকারি আদেশগুলোকে যেভাবে হাইকোর্ট নতুন করে ব্যাখ্যা করেছে, তা রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাজ্য প্রশাসনের দাবি, এই রায় কার্যকর হলে তা কেবল প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশনায় যে আইনি অস্পষ্টতা ও অসংগতি তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ একান্তই প্রয়োজন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই আইনি পদক্ষেপটি কেবল পশু সংরক্ষণের আইনি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাজ্যের প্রশাসনিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি প্রয়াস।
তামিলনাড়ুর ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞাটি যে সরাসরি সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে, তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট এই জটিল ও স্পর্শকাতর আইনি ইস্যুতে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। শীর্ষ আদালতের ওপরই এখন নির্ভর করছে তামিলনাড়ুর আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যকার এই আইনি বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।