শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার দৃঢ় প্রত্যয় উত্তর কোরিয়ার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার দৃঢ় প্রত্যয় উত্তর কোরিয়ার
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও উন্নত করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন।

 

সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ বৈঠককে তিনি বৃহত্তর প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ও ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বুধবার কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

 

এশিয়া তথা বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে কোরীয় উপদ্বীপে চলমান উত্তেজনার মাঝে এই ঘোষণাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। চীনের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টির ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে পাঠানো এক বিশেষ শুভেচ্ছাবার্তায় কিম জং উন তার দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, বেইজিংয়ের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে উন্নত ও সম্প্রসারিত করাই পিয়ংইয়ংয়ের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় অবস্থান। বুধবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির (কেসিএনএ) প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে কিমের এই বার্তার কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং অভিন্ন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া (ডিপিআরকে) এবং চীনের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক রূপ দেওয়াই যে তাদের দল ও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, সেটিও ওই বার্তায় অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে।

 

কিম জং উন তার বার্তায় রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থাকে আরও গভীর করার ক্ষেত্রে একটি অভাবনীয় ও যুগান্তকারী সুযোগ তৈরি করেছে।

 

ওই শীর্ষ সম্মেলনের সময় উভয় নেতাই তাদের দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৮ ও ৯ জুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পিয়ংইয়ং সফর করেন।

 

বিগত সাত বছরের শাসনামলে এটিই ছিল তার প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর। এই সফর দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও কৌশলগত বোঝাপড়াকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো মত প্রকাশ করেছে।

 

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে পাঠানো ওই উষ্ণ শুভেচ্ছাবার্তায় কিম জং উন আরও উল্লেখ করেন যে, উত্তর কোরিয়া এবং চীনের মধ্যকার এই মজবুত সম্পর্ক কেবল দুই দেশের সরকার বা রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উভয় দেশের সাধারণ জনগণের এক অমূল্য যৌথ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

 

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে জানিয়েছে যে, শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক এই ঐতিহাসিক সফরে দুই নেতা ভবিষ্যৎ সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্যে একটি সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত রূপরেখা গ্রহণ করেছেন।

 

অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোও এই সফরের বিষয়ে তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, পিয়ংইয়ং সফরকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও প্রসারিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

 

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তর কোরিয়ার একটি ভিন্নমুখী কূটনৈতিক তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে, যা এই নতুন প্রতিশ্রুতিকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তোলে। বিগত কয়েক বছরে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে।

 

এমনকি মস্কোর সঙ্গে পিয়ংইয়ং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে, যা পশ্চিমা বিশ্বকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর পক্ষে লড়াই করার জন্য উত্তর কোরিয়া তাদের হাজার হাজার সুদক্ষ সেনা মোতায়েন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

 

রাশিয়ার সঙ্গে এমন গভীর সামরিক সখ্যতা গড়ে ওঠা সত্ত্বেও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিম জং উনের সাম্প্রতিক এই বার্তা প্রমাণ করে যে, উত্তর কোরিয়া তার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে এবং কোনোভাবেই বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের দীর্ঘকালের পরীক্ষিত সম্পর্ককে ম্লান হতে দিতে রাজি নয়।

 

সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে রাশিয়ার সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠতা যতই বাড়ুক না কেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উত্তর কোরিয়ার কাছে চীনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পশ্চিমা দেশগুলোর নানাবিধ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধে জর্জরিত উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং টিকে থাকার একমাত্র ভরসা হিসেবে চীনই এখনো পর্যন্ত এককভাবে বৃহত্তম অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এই রূঢ় বাস্তবতাকে আরও পরিষ্কার করে তোলে। তাদের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশই এককভাবে চীনের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

 

এই বিশাল বাণিজ্য নির্ভরতাই প্রমাণ করে যে, সামরিক প্রয়োজনে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকলেও অর্থনৈতিক জীবনরেখা সচল রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য বেইজিংয়ের ওপর পিয়ংইয়ংয়ের নির্ভরতা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

 

- আল জাজিরা