আধুনিক কর্মজীবী মা-বাবারা নিজেদের কর্মক্ষেত্রে থাকাকালীন নিশ্চিন্তে সন্তানদের যেখানে নিরাপদে রাখার জন্য দিয়ে যান, ঠিক সেখানেই দুই থেকে তিন বছর বয়সী অবুঝ শিশুদের ওপর দিনের পর দিন এমন নিষ্ঠুর ও অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে।
এই অভাবনীয় ও মর্মান্তিক ঘটনায় দেশটিতে শিশু অধিকার ও করপোরেট পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ডে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
ইতিমধ্যে এই অমানবিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পাঁচজন নারী পরিচর্যাকারীর বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছে বেঙ্গালুরু পুলিশ প্রশাসন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন এবং স্থানীয় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে শিশুদের ওপর চালানো এই নির্মম নির্যাতনের যেসব ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা যেকোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দায়ের করা অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অবুঝ শিশুরা যখন স্বাভাবিক কারণে কান্না করত, তখন তাদের আদর করে বা মমতার সঙ্গে শান্ত করার বদলে চরম অমানবিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হতো।
কান্না থামাতে এই ছোট ছোট ও অসহায় শিশুদের জোরপূর্বক ফ্রন্ট-লোডিং ওয়াশিং মেশিনের ড্রামের ভেতরে ঢুকিয়ে আটকে রাখা হতো। নির্যাতনের মাত্রা কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিশুদের ভয় দেখাতে এবং মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করতে বাথরুমের টয়লেটের জেট স্প্রে দিয়ে সরাসরি তাদের মুখে তীব্র বেগে পানি ছিটানো হতো।
এমনকি, অনেক সময় তাদের দীর্ঘক্ষণ অন্ধকার বাথরুমের ভেতরে তালাবদ্ধ করে রাখা হতো, যা এই বয়সের একটি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য চরম ক্ষতিকর এবং স্থায়ী ট্রমার কারণ হতে পারে।
এই লোমহর্ষক ও অমানবিক ঘটনাটি দীর্ঘদিন শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের চার দেয়ালের আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্যাতনের কিছু ভিডিও চিত্র ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তের মধ্যেই সাধারণ মানুষের নজরে আসে।
ভিডিওগুলোতে শিশুদের ওপর চালানো নির্মমতার অকাট্য প্রমাণ পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পরপরই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।
একই সঙ্গে শিশু নির্যাতনের এই জঘন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কর্ণাটক রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের নজরে আনা হয়েছে। কমিশন ইতিমধ্যেই এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করেছে এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জোরালো আশ্বাস প্রদান করেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বেঙ্গালুরুসহ গোটা ভারতের কর্মজীবী অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, চরম আতঙ্ক ও গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক নগরজীবনে বিশেষ করে বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বা এর আশেপাশে পরিচালিত আধুনিক শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো কতটা নিরাপদ, সে বিষয়ে এখন নতুন করে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে সন্তানদের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা এসব ডে-কেয়ার সেন্টারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেন। কিন্তু সেখানে যদি শিশুদের এমন পৈশাচিক ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তবে কর্মজীবী মা-বাবারা কোথায় তাদের সন্তানদের নিরাপদে রাখবেন, সেটি এখন একটি বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি এবং কর্মীদের নিয়োগের আগে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, অতীত রেকর্ড ও পটভূমি কঠোরভাবে যাচাই করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতির মুখে এবং চারদিক থেকে আসা তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়ে অভিযুক্ত ডে-কেয়ার সেন্টারের পরিচালনাকারী করপোরেট প্রতিষ্ঠানটি গণমাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে।
বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য, সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা কোনোভাবেই এ ধরনের অমানবিক আচরণ সমর্থন করে না এবং এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বেঙ্গালুরু পুলিশ ও রাজ্য শিশু অধিকার কমিশনের চলমান স্বাধীন তদন্তে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং সতর্কতামূলক ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বেঙ্গালুরুর ওই নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রটির সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর প্রতি অন্ধ বিশ্বাস না রেখে নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকির কোনো বিকল্প নেই।