শুক্রবার, জুলাই ৩, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রেমের সম্পর্কের জেরে ধর্মান্তর এবং পুনরায় স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন, প্রেমিকা গ্রেপ্তার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

প্রেমের সম্পর্কের জেরে ধর্মান্তর এবং পুনরায় স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন, প্রেমিকা গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

ভালোবাসার সম্পর্কের পরিণতিতে ধর্ম পরিবর্তন এবং পরবর্তীতে পুনরায় নিজের আদি ধর্মে ফিরে আসার এক অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা ঘটেছে ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে। রাজ্যের শামলি জেলায় ঘটা এই ঘটনাটি বর্তমানে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

জানা গেছে, এক যুবকের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং কিছুদিন পর পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার পর, ওই যুবকের প্রেমিকা এবং প্রেমিকার বাবাকে রাজ্যের বিতর্কিত ধর্মান্তর বিরোধী আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করেছে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ।

 

একটি আন্তঃধর্মীয় প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আইনি পদক্ষেপ এবং সামাজিক টানাপোড়েনের এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বিশেষ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আয়ুষ মালিক নামের এক যুবক।

 

২০১৮ সালে পায়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানীয় একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন আয়ুষ। সেখানেই চিকিৎসা চলাকালীন চাঁদনি কুরেশি নামক এক নারী ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়। চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং আলাপচারিতা চলতে থাকে।

 

ধীরে ধীরে এই পেশাদার পরিচয় একটি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্কে রূপ নেয় এবং এক পর্যায়ে তারা দুজনে গভীর প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু এই সম্পর্ক সময়ের সাথে সাথে ধর্মীয় ও সামাজিক জটিলতার আবর্তে প্রবেশ করে।

 

আয়ুষের পরিবারের দাবি এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে জানা যায়, সম্পর্কের এক পর্যায়ে চাঁদনির পরিবারের পক্ষ থেকে আয়ুষের ওপর ধর্ম পরিবর্তনের জন্য ক্রমাগত মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হতে থাকে।

 

প্রেমের টানে এবং প্রেমিকাকে আপন করে নেওয়ার তীব্র বাসনায় আয়ুষ শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। স্বভাবতই, একটি হিন্দু পরিবার থেকে আসা আয়ুষের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তার পরিবার চরম আপত্তি জানায় এবং তারা কোনোভাবেই এই ধর্মান্তর মেনে নিতে রাজি হয়নি।

 

তবে পরিবারের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও আয়ুষ প্রাথমিকভাবে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৩ সালে চাঁদনির পরিবার আয়ুষকে নিয়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যায় এবং সেখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে তার ধর্মান্তরের আইনি ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

 

ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর আয়ুষ নিজের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখেন 'মহম্মদ আলি'। নতুন ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ নতুন এক জীবনযাপন শুরু করেন। ইসলামের রীতিনীতি ও আদর্শ নিষ্ঠার সাথে পালন করতে শুরু করেন তিনি।

 

নিজের সাজপোশাকে ব্যাপক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নিয়ম করে দিনে পাঁচবার নামাজ আদায় এবং দাড়ি রাখা শুরু করেন। দীর্ঘ কয়েক মাস তিনি এই নতুন ধর্মীয় পরিচয়েই জীবন অতিবাহিত করেন।

 

তবে দীর্ঘ সময় এই নতুন পরিচয়ে জীবনযাপনের পর সম্প্রতি তিনি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় তার পূর্বপুরুষের ধর্ম, অর্থাৎ হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

 

সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আয়ুষ আবেগাপ্লুত হয়ে জানান যে, তার ধর্মান্তরের কারণে পরিবারের সদস্যদের অবর্ণনীয় মানসিক যন্ত্রণা এবং কষ্ট তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না।

 

পিতা-মাতা ও স্বজনদের এমন সীমাহীন কষ্টের দৃশ্য দেখে তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি আরও জানান যে, এখন থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিজের পরিবারের সাথেই বসবাস করতে চান।

 

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সম্প্রতি ধর্মীয় আচার ও পূজার্চনার মাধ্যমে আয়ুষ পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে এসেছেন। এর অংশ হিসেবে তিনি তার চুল ও দাড়ি কেটে ফেলেন এবং সনাতন ধর্মের রীতিনীতি মেনে প্রয়োজনীয় আচার সম্পন্ন করেন।

 

ছেলের এই প্রত্যাবর্তনে আয়ুষের বাবা দেবরাজ মালিক গভীর স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং তিনি নিশ্চিত করেছেন যে তার ছেলে এখন সম্পূর্ণভাবে সনাতন ধর্মে ফিরে এসেছে। তবে ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি। ছেলের প্রত্যাবর্তনের পরপরই দেবরাজ মালিক স্থানীয় থানায় চাঁদনি এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

 

দেবরাজ মালিকের দায়ের করা ওই অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র প্রেমের ফাঁদে ফেলে নয়, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আয়ুষের ধর্ম পরিবর্তন করানো হয়েছিল। তার অভিযোগ, এই ধর্মান্তরের নেপথ্যে ছিল আয়ুষের পরিবারের কোটি কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তি আত্মসাৎ করার এক গভীর ষড়যন্ত্র।

 

চাঁদনি এবং তার পরিবার অসৎ উদ্দেশ্যে আয়ুষকে ব্যবহার করে ওই পারিবারিক সম্পত্তি হাতানোর ছক কষছিল বলে তিনি দাবি করেন। এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং রাজ্যের কঠোর ধর্মান্তর বিরোধী আইনের আওতায় চাঁদনি ও তার বাবাকে গ্রেপ্তার করে আইনি হেফাজতে নিয়ে যায়। এই ঘটনাটি আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক এবং ধর্মান্তর নিয়ে ভারতের বর্তমান আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল রূপ আবারও জনসমক্ষে উন্মোচন করেছে।