গুরুতর আহতদের অনেকের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বেশিমাত্রায় বাড়তে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে এই রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রাণঘাতী ও সুপরিকল্পিত হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
বেলুচিস্তানভিত্তিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য বালোচিস্তান পোস্ট’ এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'ইন্ডিয়া টুডে'-এর এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ হামলার খবর প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। হামলার পরপরই বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) আনুষ্ঠানিকভাবে এর দায় স্বীকার করে একটি গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে কয়েক দশক আগেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তারপরও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে গোষ্ঠীটি ওই অঞ্চলে তাদের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে এবং প্রায়শই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে থাকে।
হামলার ভয়াবহতা ও ধরন সম্পর্কে বিএলএ-এর মুখপাত্র জিয়ান্দ বালোচ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, শুক্রবার স্থানীয় সময় ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
বিএলএ-এর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ হিসেবে পরিচিত আত্মঘাতী সশস্ত্র শাখা ‘মাজিদ ব্রিগেড’-এর একজন সদস্য, যার নাম আতাউল্লাহ বালোচ ওরফে আজমল বালোচ, একটি বিস্ফোরকভর্তি মাজদা ট্রাক চালিয়ে সরাসরি ওই কোস্টগার্ড ঘাঁটির ভেতরে প্রবেশ করেন।
ঘাঁটির ভেতরে প্রবেশের পরপরই তিনি ট্রাকে থাকা বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটান। এই হামলায় অত্যন্ত শক্তিশালী ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বিবৃতিতে জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুখপাত্র জিয়ান্দ বালোচ তার বিবৃতিতে বলেন, “শক্তিশালী এই বোমা বিস্ফোরণের ফলে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর (পাকিস্তান) ওই সুরক্ষিত সামরিক শিবিরটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।” তবে হামলাটি কেবল আত্মঘাতী বিস্ফোরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
জিয়ান্দ বালোচ আরও জানান যে, হামলার নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কোস্টগার্ড ঘাঁটির আশেপাশে আগে থেকেই অত্যন্ত গোপনে অবস্থান নিয়েছিলেন বিএলএ-এর আরেক সশস্ত্র শাখা ‘ফাতেহ স্কোয়াড’-এর যোদ্ধারা।
প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পরপরই তারা দ্রুত ওই ঘাঁটির ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানে উপস্থিত নিরাপত্তা রক্ষীদের ওপর এলোপাতাড়ি ও অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু করেন। প্রাথমিক আত্মঘাতী বিস্ফোরণের আকস্মিকতা কাটিয়ে ওঠার আগেই পরবর্তীতে এই অতর্কিত সশস্ত্র হামলার কারণে হতাহতের সংখ্যা এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এদিকে, নিজেদের দাবির সপক্ষে বিএলএ-এর নিজস্ব গণমাধ্যম শাখা ‘হাক্কাল’ এই ভয়াবহ হামলার একটি ভিডিওচিত্রও জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে। তেতাল্লিশ সেকেন্ড দীর্ঘ ওই ভিডিওচিত্রে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, বিস্ফোরণের ঠিক আগমুহূর্তে একটি ট্রাক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কোস্টগার্ডের ওই সুরক্ষিত ঘাঁটির দিকে ধেয়ে যাচ্ছে এবং সীমানা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে।
ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি মূলত তাদের নিখুঁত হামলার সক্ষমতা এবং ভয়াবহতার বার্তাটিই সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছে। বিএলএ তাদের বিবৃতিতে এই হামলার পেছনের মূল কারণও স্পষ্ট করেছে। সম্প্রতি বেলুচিস্তানের বিভিন্ন জেলায় এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে নির্মূল করার লক্ষ্যে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ও জোরদার অভিযান শুরু করেছে।
গোষ্ঠীটির দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান সেই সাঁড়াশি অভিযানের সরাসরি জবাব দিতে এবং প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই জিওয়ানির এই কোস্টগার্ড ঘাঁটিতে এমন ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ওই অঞ্চলে পাকিস্তান সরকার এবং স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আরও একধাপ চরম আকার ধারণ করেছে।
এত বড় একটি প্রাণঘাতী ও মর্মান্তিক ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।
সরকার নীরব থাকলেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলার ফলে বেলুচিস্তানের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে এবং আগামী দিনগুলোতে ওই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর অভিযান আরও তীব্রতর হতে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে চরম পিছিয়ে থাকা বেলুচিস্তান প্রদেশে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ হামলাটি সেই দীর্ঘস্থায়ী সংকটেরই একটি রক্তাক্ত বহিঃপ্রকাশ।