রাজ্যের চিক্কাবল্লাপুর জেলার একটি আদালতের ভেতরে খোদ বিচারকের চেয়ারে কালো জাদু বা তান্ত্রিক আচার পালনের গুরুতর অভিযোগে পঁয়ষট্টি বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ।
মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে, যা ইতিমধ্যে পুরো দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি সুরক্ষিত আদালত প্রাঙ্গণে এহেন কুসংস্কারাচ্ছন্ন কর্মকাণ্ড কেবল সাধারণ মানুষকেই নয়, বরং খোদ প্রশাসনকেও হতবাক করেছে।
আদালত ও স্থানীয় পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই রহস্যময় ঘটনার সূত্রপাত হয় বেশ কয়েকদিন আগে। চিক্কাবল্লাপুর শহরের প্রথম অতিরিক্ত সিনিয়র সিভিল জজ ও প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে এই অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটে।
প্রতিদিনের মতো আদালতের নিরাপত্তা কর্মীরা রুটিনমাফিক সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ডিং পরীক্ষা করছিলেন। দুই দিন আগের ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করার সময় হঠাৎ করেই তাদের চোখে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য ধরা পড়ে।
ফুটেজে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, অভিযুক্ত ওই প্রবীণ নারী অত্যন্ত সন্তর্পণে এজলাসের ভেতরে প্রবেশ করছেন। এরপর তিনি সরাসরি বিচারকের বসার নির্দিষ্ট আসনের কাছে যান এবং সেখানে মন্ত্রপূত সাদা সরিষা ছিটিয়ে এক ধরনের তান্ত্রিক বা গুপ্ত আচার পালন করতে শুরু করেন।
বিচারকের মতো এমন একটি স্পর্শকাতর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসনে এ ধরনের সন্দেহজনক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড দেখে নিরাপত্তা কর্মীরা অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেন।
সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিচারব্যবস্থার পবিত্রতা এবং বিচারকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আদালতের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা কালক্ষেপণ না করে স্থানীয় থানায় একটি আনুষ্ঠানিক ও লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
সেই লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে তদন্তে নামে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ওই নারীকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ওই নারীর নাম মঞ্জুলা। অভিযোগ দায়েরের পরপরই পুলিশ তাকে নিজ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায় এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
এই ঘটনার আইনি দিকটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পুলিশ জানিয়েছে, আধুনিক যুগে এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও অমানবিক প্রথা নির্মূল করার লক্ষ্যে প্রণীত বিশেষ আইনের আওতায় ওই নারীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। কর্ণাটক রাজ্যের ২০১৭ সালের অমানবিক কুপ্রথা ও কালো জাদু প্রতিরোধ ও নির্মূল আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় মঞ্জুলার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই আইনটি মূলত সমাজের বুক থেকে অন্ধবিশ্বাস, কালো জাদু এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত নানাবিধ অমানবিক প্রথাগুলো চিরতরে দূর করার উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছিল। একটি বিচারালয়ে, যেখানে যুক্তি, প্রমাণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত, ঠিক সেখানেই এমন একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন অপরাধের ঘটনা এই কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও একবার জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে।
গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্ত মঞ্জুলাকে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হয়। সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিজ্ঞ বিচারক পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে তাকে চৌদ্দ দিনের বিচারবিভাগীয় বা জুডিশিয়াল হেফাজতে পাঠানোর সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন।
তবে এই ঘটনার পেছনের মূল রহস্য উন্মোচনে পুলিশের বহুমুখী তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। একজন পঁয়ষট্টি বছর বয়সী নারী কেন এমন একটি সুরক্ষিত জায়গায় প্রবেশ করে কালো জাদু করার চেষ্টা করলেন, তার পেছনে অন্য কোনো গভীর উদ্দেশ্য বা তৃতীয় কোনো পক্ষের প্ররোচনা রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
ওই আদালতে মঞ্জুলার নিজের, তার পরিবারের অথবা পরিচিত কোনো ব্যক্তির মামলা বিচারাধীন ছিল কি না এবং সেই মামলার রায় নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করতেই তিনি এমন অদ্ভুত ও বেআইনি পথ বেছে নিয়েছিলেন কি না, পুলিশ সেই দিকটিও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও এখনো অন্ধবিশ্বাস এবং কালো জাদুর মতো কুসংস্কারের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত স্তম্ভ আদালতের ভেতরে এমন ঘটনা নিশ্চিতভাবেই একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
এই ঘটনাটি একদিকে যেমন দেশের আদালত প্রাঙ্গণগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষার প্রসার ও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারের পাশাপাশি এ ধরনের ভিত্তিহীন চিন্তাধারার বিরুদ্ধে যে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক লড়াই অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, কর্ণাটকের এই নজিরবিহীন ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।