এবার সেই পতনের তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে ভারী নাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত, ছায়াসঙ্গী এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কামারহাটির প্রভাবশালী বিধায়ক মদন মিত্র দলের সঙ্গে তার দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ইতি টেনেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংকটের কফিনে শেষ পেরেকগুলোর একটি। এর আগে রাজ্যের সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিম, সাবেক অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এবং জাবেদ খানের মতো দলের একেবারে প্রথম সারির নেতারাও মমতা শিবির ত্যাগ করেছেন।
তবে মদন মিত্রের মতো একজন বর্ষীয়ান, জনপ্রিয় ও তৃণমূল স্তরের নেতার আকস্মিক প্রস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি নিঃসঙ্গ ও দুর্বল করে তুলবে বলে জোরালোভাবে মনে করা হচ্ছে।
বুধবার রাজ্য বিধানসভার ভেতরে এক নাটকীয় ও অভাবনীয় দৃশ্যপট রচিত হয়। বিধানসভায় বসে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে দলত্যাগের এই ঘোষণা দেন মদন মিত্র।
এদিন তিনি গণমাধ্যমের সামনে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো ও কর্মপদ্ধতির মধ্যে তার পক্ষে আর কাজ চালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দলত্যাগের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের জাতীয় কমিটির মুখ্য সচেতক (চিফ হুইপ), কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সাধারণ সম্পাদকের পদসহ দলের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
বিরোধী দলনেতার পাশে বসে তার এই পদত্যাগের ঘোষণা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। নিজের এই আকস্মিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মদন মিত্র অত্যন্ত আবেগময় অথচ সুকৌশলী ভাষার ব্যবহার করেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, জীবন ও মরণের এক সংকটময় সাঁকোর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে এই কঠিন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করে এবং তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত আনুষ্ঠানিক পদ থেকে তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিয়েছেন।
তবে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে তিনি এক অভিনব ও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি দাবি করেন যে, তিনি রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলেই ছিলেন এবং আদর্শগতভাবে তৃণমূলেই রয়ে গেছেন, কেবল একটি কক্ষ থেকে অন্য একটি কক্ষে তার ভৌত অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগের স্থানে সুখের পালঙ্ক থাকলেও বর্তমান স্থানে কেবল একটি সাধারণ খাটিয়া রয়েছে, আর তিনি সাধারণ মানুষের নেতা হিসেবে সেই সাদামাটা জীবন ও অবস্থানকেই নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন।
মদন মিত্রের এই নাটকীয় দলবদলের পরপরই বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। মদন মিত্রকে নিজের পাশে বসিয়ে তিনি গণমাধ্যমের সামনে দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, তাদের এই নবীন রাজনৈতিক সংগ্রাম মূলত দলে আধিপত্যবাদ এবং একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আরও উল্লেখ করেন যে, মদন মিত্রের মতো একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধি এবং সাবেক মন্ত্রীর তাদের শিবিরে যোগদানের ফলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ঘটনাকে তিনি তাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আদর্শের একটি বড় বিজয় হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহল এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মদন মিত্রের এই আকস্মিক দলবদলের নেপথ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গভীরতর বাস্তব কারণ খুঁজে পাচ্ছেন।
তাদের মতে, আদর্শগত দ্বন্দ্ব বা নীতিগত পার্থক্যের চেয়েও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ক্রমবর্ধমান আইনি চাপই মদন মিত্রের এই চরম সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
রাজ্যের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত হাজার কোটি টাকার বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা বা চিটফান্ড কেলেঙ্কারির মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে মদন মিত্রের নাম অনেক আগে থেকেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নথিতে যুক্ত রয়েছে।
এর পাশাপাশি, সম্প্রতি রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী শিক্ষা ও অন্যান্য খাতের নিয়োগ দুর্নীতি মামলাতেও নতুন করে তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং পুত্রবধূর নাম গভীরভাবে জড়িয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এই বহুমুখী আইনি পদক্ষেপ এবং মানসিক চাপের মুখে নিজের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতেই তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে দলবদল করেছেন।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিকল্প রাজনৈতিক বলয়ে বা তথাকথিত 'আসল' তৃণমূলে আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে তিনি মূলত রাজনৈতিক ঢাল ব্যবহার করে আইনি জটিলতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে রাজনৈতিক মহলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
এই আলোচিত দলবদলের ফলে রাজ্যের আগামী দিনের রাজনীতিতে এবং চলমান আইনি তদন্তের গতিপ্রকৃতিতে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও জল্পনাকল্পনা তৈরি হয়েছে।