প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হ্যাকার চক্রটি মূলত বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষিত তথ্যভাণ্ডারে অনুপ্রবেশ করে ডেটা চুরি করে থাকে এবং পরবর্তীতে সেই বেহাত হওয়া তথ্যের বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের আর্থিক মুক্তিপণ দাবি করে।
ভারতের মোট সাতটি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে কুদানকুলাম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা কেকেএনপি আয়তন ও উৎপাদন ক্ষমতায় সবচেয়ে বড়। ফলে, এই স্পর্শকাতর স্থাপনার তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি সার্বিকভাবে দেশটির জাতীয় ও পারমাণবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই সাইবার হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের হাতে আসা বিপুল পরিমাণ তথ্য ও নথিপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনার পর জানা গেছে, হ্যাকার গোষ্ঠীটি কুদানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ১৯ হাজার গোপন নথি ফাঁস করেছে, যার সম্মিলিত ডিজিটাল আকার প্রায় ১৪ দশমিক ৩ গিগাবাইট।
এই সুবিশাল ও জটিল তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের সূক্ষ্ম নকশা, ব্যবহৃত অতি-সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির কারিগরি বিবরণ, সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের বিস্তারিত পরিচিতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার রূপরেখাসহ নানা গোপন তথ্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হ্যাক হওয়া মূল সার্ভারটিতে সর্বমোট আট লাখ আটান্ন হাজার তথ্য সংরক্ষিত ছিল। এই তথ্যগুলো মূলত ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের জন্য নথিবদ্ধ করা ছিল এবং ফাঁস হওয়া অংশটি এই সুবিশাল ভাণ্ডারের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশগুলোর একটি।
তবে সামগ্রিক উদ্বেগের মাঝে একটি স্বস্তির বিষয় হলো, পরমাণু কেন্দ্রটির মূল নকশা বা কোর সিস্টেমের কোনো তথ্য এই ফাঁস হওয়া ডেটার মধ্যে পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, কুদানকুলাম প্রকল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কোর সিস্টেমটি সরবরাহ করেছিল রাশিয়ার স্বনামধন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটম।
জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এই নজিরবিহীন সাইবার বিপর্যয়ের পর, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও দায় এড়ানোর স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
কুদানকুলাম বিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্যতম প্রধান ঠিকাদার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানির অনুজ, অনিল আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স গ্রুপ। বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, পরমাণু কেন্দ্রটির তথ্য যে সার্ভারে জমা ছিল, তার কিছু অংশ হ্যাকারদের অনুপ্রবেশের কারণে বেহাত হয়ে গেছে।
রিলায়েন্স গ্রুপের দাবি, ওই নির্দিষ্ট সার্ভারটি রক্ষণাবেক্ষণ ও দৈনন্দিন পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্বে ছিল ইয়োত্তা নামের একটি ভারতীয় ডেটা পরিষেবা প্রদানকারী স্টার্টআপ কোম্পানি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার অনুপ্রবেশের বিষয়টি ইতোমধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে বলেও রিলায়েন্স গ্রুপ তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে।
তবে ঠিক কী ধরনের এবং কতটুকু সংবেদনশীল তথ্য বেহাত হয়েছে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্টভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, ডেটা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ইয়োত্তা রিলায়েন্স গ্রুপের এই একতরফা দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে একটি কড়া পাল্টা বিবৃতি প্রদান করেছে।
তাদের কারিগরি দলের দাবি অনুযায়ী, যে সার্ভার থেকে এই স্পর্শকাতর তথ্যগুলো ফাঁস হয়েছে, সেটি মূলত রিলায়েন্স গ্রুপের নিজস্ব সার্ভার এবং সেটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা ফায়ারওয়াল ব্যবস্থায় আগে থেকেই দুর্বলতা বিদ্যমান ছিল।
ইয়োত্তা তাদের বিবৃতিতে জানায়, গত ২৯ মে তারা রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মালিকানাধীন ও তাদের প্ল্যাটফর্মে হোস্ট করা ওই সার্ভারটিতে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক কার্যকলাপ লক্ষ্য করে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে রিলায়েন্স গ্রুপকে জানানো হয় এবং সন্দেহভাজন র্যানসমওয়্যার বা মুক্তিপণ আদায়কারী ম্যালওয়্যারটির কার্যকর হওয়া রোধ করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় কারিগরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে জুন মাসের শেষের দিকে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইয়োত্তাকে জানায় যে, কোনো এক অজ্ঞাত ‘বহিরাগত পক্ষ’ বা হ্যাকার গোষ্ঠী তাদের কাছে ডেটা ফাঁসের হুমকি দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করছে।
ইয়োত্তার এই বিবৃতি থেকে এটি পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কুদানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মূলত জুন মাসেই চুরি হয়েছিল, যা দরকষাকষিতে ব্যর্থ হওয়ার পর সম্প্রতি হ্যাকার গোষ্ঠী জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিয়েছে।
পরমাণু স্থাপনার মতো এমন একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জাতীয় কাঠামোর তথ্য ফাঁসের ঘটনাকে ভয়াবহ নিরাপত্তা বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সাইবার ও পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ বিষয়ক মার্কিন অলাভজনক সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভস’-এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিকোলাস রোথ এই ঘটনাকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সার্বিক ও ভৌত নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকিস্বরূপ বলে অভিহিত করেছেন।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, ফাঁস হওয়া এই সংবেদনশীল কারিগরি তথ্যগুলো যদি কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রবিরোধী দুষ্কৃতিকারীদের হাতে পৌঁছায়, তবে তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ওই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভৌত হামলা বা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের ছক কষতে সক্ষম হবে।
কারণ, এই ডেটাবেসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পর্শকাতর অংশগুলোতে কীভাবে প্রবেশ করা যায় এবং নিরাপত্তার কোন স্তর পর্যন্ত অনায়াসে পৌঁছানো সম্ভব, তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। উদ্ভূত এই সংকটজনক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে ভারত সরকার।
দেশটির পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্রধান নিয়ন্ত্রক ও অভিভাবক সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া’ সার্ভারের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে রিলায়েন্স গ্রুপের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
একই সঙ্গে, ভারতের সর্বোচ্চ সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ এই ভয়াবহ তথ্য ফাঁসের ঘটনার পেছনের মূল কারণ ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে।