বাধ্য হয়ে কর্মস্থলের বন্দিদশা থেকে পালিয়ে বর্তমানে তিনি মাসকাটে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। সেখানে অবস্থান করে নিজ দেশে এবং পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন এই অসহায় নারী।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের এই ঘটনাটি নতুন করে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্যাতনের শিকার ওই নারীর নাম শবনম বেগম। তিনি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তেলেঙ্গানার রাজধানী হায়দরাবাদের পাহাড়ি শরিফ এলাকার একজন সাধারণ বাসিন্দা।
উন্নত ভবিষ্যতের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ওমানে পাঠানো হয়েছিল। পারিবারিক ও সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৬ মার্চ আরশাদ নামের স্থানীয় এক মানব পাচারকারী বা নিয়োগদাতা এজেন্টের প্রলোভনে পড়ে তিনি মাসকাটে পাড়ি জমান।
ওই এজেন্ট তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ওমানে গৃহকর্মীর কাজ করলে তাকে প্রতি মাসে অন্তত ২০০ ওমানি রিয়াল বেতন হিসেবে প্রদান করা হবে। কিন্তু মাসকাটে পৌঁছানোর পরপরই তার সেই দেখা স্বপ্ন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
সেখানে তাকে একটি নির্দিষ্ট বাড়ির বদলে একাধিক বাড়িতে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা হাড়ভাঙা খাটুনি করতে বাধ্য করা হতো, যা আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। শবনম বেগমের অভিযোগ, দীর্ঘ এই শ্রমের বিনিময়ে তাকে কোনো পারিশ্রমিক তো দেওয়া হয়নি, বরং তার বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারগুলোও নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
টানা প্রায় চার মাস ধরে তাকে কোনো ধরনের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। কাজ করার পাশাপাশি তার জন্য পর্যাপ্ত খাবার এবং বাসস্থানেরও কোনো সুস্থ বা মানবিক ব্যবস্থা ছিল না। এই অমানবিক পরিস্থিতি এবং ধারাবাহিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি একপর্যায়ে এর জোরালো প্রতিবাদ করেন এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার গভীর ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
কিন্তু দেশে ফেরার কথা বলার অপরাধে তাকে যে এজেন্সির অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে কর্মরত নিষ্ঠুর ব্যক্তিরা তার ওপর সরাসরি শারীরিক নির্যাতন চালায়। তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তার সব ধরনের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ দেড় মাস ধরে তাকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। ফলে নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কারও সঙ্গেই তিনি কোনো প্রকার যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেননি। তার নিজের পাসপোর্ট এবং বিদেশ ভ্রমণের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও নিয়োগদাতা এজেন্টের কাছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে।
এই দুর্বিষহ বন্দিদশা এবং চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে নিজের জীবন বাঁচাতে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে কোনোমতে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর তিনি সরাসরি মাসকাটে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে উপস্থিত হন এবং সেখানে নিজের সার্বিক নিরাপত্তা ও জীবনের আশ্রয় প্রার্থনা করেন।
গত আট দিন ধরে তিনি ওই দূতাবাসের ভেতরেই এক প্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর বিষয়টি হলো, শবনম বেগম জানিয়েছেন, মাসকাটের ওই ভারতীয় দূতাবাসে তিনি একা নন।
তার মতো আরও অন্তত ১৩০ জন নারী সেখানে আগে থেকেই আশ্রয় নিয়ে আছেন, যারা প্রত্যেকেই অনুরূপ মানব পাচার, প্রতারণা ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রহর গুনছেন।
এই হৃদয়বিদারক তথ্যটি মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাচার এবং তাদের ওপর চলা পদ্ধতিগত শোষণের এক ভয়াবহ চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সিয়াসাত ডেইলিতে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ ভিডিও বার্তায় শবনম বেগম নিজেই তার ওপর হওয়া এই ভয়াবহ নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
ভিডিওতে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, হায়দরাবাদে তার তিন মেয়ে এবং এক ছেলেসহ চার অবুঝ সন্তান তার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। সন্তানদের বুকে ফিরে যেতে তিনি ভারত সরকারের দ্রুত ও অত্যন্ত কার্যকর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর শবনমের পরিবারও চরম হতাশা ও গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছে। তার স্বামী মোহাম্মদ চাঁদ ইতোমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কাছে একটি অত্যন্ত জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন।
ওই আনুষ্ঠানিক চিঠিতে তিনি মাসকাটের দূতাবাসে অবস্থানরত তার স্ত্রীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুস্থ অবস্থায় হায়দরাবাদে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে যে স্থানীয় এজেন্ট মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তার স্ত্রীকে এমন ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এই অমানবিক ঘটনাটি বিশ্ববাসীকে আবারও প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বিদেশে কাজের সন্ধানে যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকদের, বিশেষ করে অসহায় নারীদের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও কঠোর নজরদারি এবং শক্তিশালী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।