সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অশালীন শব্দ বা গালাগাল ব্যবহার আইনের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা নয়- ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

অশালীন শব্দ বা গালাগাল ব্যবহার আইনের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা নয়- ভারতের সুপ্রিম কোর্ট
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের বিচার ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, কেবল অশালীন শব্দ, কুরুচিপূর্ণ ভাষা কিংবা সাধারণ গালাগাল ব্যবহার করলেই তা আইনের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা হিসেবে গণ্য হবে না।

 

দৈনন্দিন জীবনে বা বিবাদের সময় ব্যবহৃত কটু কথা সামাজিকভাবে যতই আপত্তিকর বা অভদ্রতার শামিল হোক না কেন, ফৌজদারি আইনে তাকে সরাসরি অশ্লীলতার অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার কোনো সুযোগ নেই।

 

শুক্রবার একটি পুরোনো মামলার আপিল শুনানি শেষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ এই সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাকস্বাধীনতা এবং ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই রায়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হিসেবে কাজ করবে।

 

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি বিপুল এম. পাঞ্চোলির সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায়টি ঘোষণা করেন। শুনানিকালে আদালত আইনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য বা আচরণকে আইনিভাবে অশ্লীল হিসেবে প্রমাণ করতে হলে তার কিছু সুনির্দিষ্ট উপাদান থাকতে হবে।

 

বিশেষ করে, ওই বক্তব্য বা আচরণের মধ্যে এমন কোনো উপাদান থাকতে হবে যা মানুষের মনে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করে, কুরুচিপূর্ণ বা কামুক আগ্রহ উসকে দেয় এবং সর্বোপরি তা সমাজের সাধারণ মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটানোর স্পষ্ট প্রবণতা রাখে।

 

আদালত অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, কেবল রাগের বশবর্তী হয়ে বা ঝগড়ার সময় ব্যবহৃত কোনো কটু শব্দ এই মাপকাঠিতে পড়ে না। তাই ঢালাওভাবে যেকোনো গালাগালকে অশ্লীলতার অভিযোগে বিচারিক কাঠামোয় আনা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

 

এই আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ভারতীয় দণ্ডবিধির দুই শত চুরানব্বই (খ) ধারার প্রসঙ্গটি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। আদালত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দণ্ডবিধির এই নির্দিষ্ট ধারায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে কেবল অশালীন শব্দ ব্যবহারই যথেষ্ট নয়।

 

বরং রাষ্ট্রপক্ষ বা অভিযোগকারীকে সন্দেহাতীতভাবে এটিও প্রমাণ করতে হবে যে, অভিযুক্তের এমন আচরণের কারণে জনসমক্ষে উপস্থিত অন্য সাধারণ মানুষের মনে তীব্র বিরক্তি, ক্ষোভ বা উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।

 

কিন্তু বর্তমান এই আলোচিত মামলার নথিপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে সর্বোচ্চ আদালত দেখতে পান যে, জনসমক্ষে এ ধরনের বিরক্তি বা উৎকণ্ঠা সৃষ্টির কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ সেখানে উপস্থাপন করা হয়নি।

 

এমনকি স্বয়ং অভিযোগকারী বা সেখানে উপস্থিত অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তি অভিযুক্তের গালাগালের কারণে সামাজিকভাবে চরম বিরক্ত হয়েছেন-এমন কোনো অকাট্য দাবি বা আইনি প্রমাণও আদালতের সামনে আনা সম্ভব হয়নি।

 

ফলস্বরূপ, ভারতীয় দণ্ডবিধির ওই সুনির্দিষ্ট ধারায় অপরাধ প্রমাণের জন্য যেসব আইনি উপাদানের উপস্থিতি অপরিহার্য, এই মামলায় তার সুস্পষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই আইনি প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে।

 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষিজমির মালিকানা ও সীমানা সংক্রান্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী বিরোধকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার জন্ম হয়। মামলার প্রাথমিক বিবরণী থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন কৃষিজমি নিয়ে প্রথমে আবেদনকারী ব্যক্তি এবং তার নিজের ভগ্নিপতির মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি ও বাগবিতণ্ডা হয়।

 

এই ঘটনার ঠিক দুই দিন পর, একই জমির মালিকানা নিয়ে ওই আবেদনকারী পুনরায় অভিযোগকারীর আপন ভাতিজার সঙ্গে এক প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। বিবাদ যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন অভিযোগকারী পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং মধ্যস্থতা করার উদ্দেশ্যে সেখানে উপস্থিত হন।

 

অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, মধ্যস্থতা করতে গেলে আবেদনকারী ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন এবং তার সম্প্রদায়কে ইঙ্গিত করে চরম জাতিগত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছুড়ে দেন।

 

এই ঘটনার পর স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ দায়ের করা হলে আনুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচারিক আদালত প্রাথমিকভাবে আবেদনকারীকে ভারতীয় দণ্ডবিধির অশ্লীল আচরণের ধারা, গুরুতর আঘাত প্রদানের ধারা এবং ফৌজদারি অপরাধের ভীতি প্রদর্শনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিল।

 

শুধু তাই নয়, জাতিগত মন্তব্যের কারণে তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের অত্যন্ত কঠোর ধারাগুলোতেও তাকে দণ্ডিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের উচ্চ আদালতও বিচারিক আদালতের সেই রায় অপরিবর্তিত রাখেন।

 

তবে চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর সর্বোচ্চ আদালত আইনি ব্যাখ্যার মাধ্যমে পুরো পরিস্থিতি স্পষ্ট করেন। সর্বোচ্চ আদালত অন্যান্য অপরাধের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করলেও, কেবল গালাগালকে অশ্লীলতা হিসেবে আখ্যায়িত করে যে ঢালাও আইনি প্রয়োগ করা হয়েছিল, তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছেন।

 

এনডিটিভি