সোমবার, জুলাই ২০, ২০২৬
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে ভয়াবহ হড়কা বান ও ভূমিধস, নিহত অন্তত ১৯

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

ভারতে ভয়াবহ হড়কা বান ও ভূমিধস, নিহত অন্তত ১৯
ছবি : Collected

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের বেশ কয়েকটি অঞ্চল। টানা মৌসুমী বৃষ্টির প্রভাবে সৃষ্ট ভয়াবহ হড়কা বান এবং আকস্মিক ভূমিধসে দেশটিতে অন্তত ১৯ জন মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

 

এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ড এবং ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মির। বৈরী আবহাওয়া ও চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি এবং সমতল এলাকাগুলোতে পুরোদমে জোরদার উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে দেশটির বেসামরিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষ।

 

রোববার ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং ভারতীয় স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের করুণ চিত্র তুলে ধরেছে। দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে বর্তমানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

 

সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ডে ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আটজন সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

নাগাল্যান্ডের দুর্গম পাহাড়ি জেলা মোন-এর স্থানীয় প্রশাসন বর্তমানে উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

মোন জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওয়েনইয়ি কোনিয়াক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপিকে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে বলেন, আকস্মিক ভূমিধস ও বন্যার কারণে এখন পর্যন্ত আটজনের মৃত্যুর খবর সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।

 

তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে আরও জানান, নিহত আটজনের মধ্যে চারজনের মৃতদেহ ইতোমধ্যে কাদামাটি ও পাহাড়ের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নিখোঁজ অবশিষ্টদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ এখনও নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে।

 

এই ভয়াবহ দুর্যোগের কারণে ওই এলাকায় আরও অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এবং লাগাতার ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উদ্ধারকর্মীদের চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

 

অন্যদিকে, ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় ভূস্বর্গ খ্যাত জম্মু ও কাশ্মিরেও হড়কা বানের কারণে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সরকারি তথ্যমতে, সেখানে এই প্রলয়ঙ্কারী ও আকস্মিক বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১১ জন অসহায় মানুষ।

 

জম্মু ও কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এক আনুষ্ঠানিক শোকবার্তায় রাজৌরি এলাকায় আকস্মিক বন্যায় হতাহতের এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। তিনি তার বিবৃতিতে বলেছেন, বন্যার প্রবল স্রোত ও তোড়ে ওই অঞ্চলের সরকারি ও বেসরকারি সম্পদের ব্যাপক ও অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

 

বন্যার পানি প্রবল বেগে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় স্থানীয় প্রধান বাসস্ট্যান্ডসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্থাপনা ও সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সার্বিক এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অগণিত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত ও স্থবির হয়ে পড়েছে।

 

যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সরবরাহ এবং উদ্ধার কাজেও দারুণ বেগ পেতে হচ্ছে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এনডিটিভি তাদের এক বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জম্মু অঞ্চলে প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে অন্তত ১১ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি এখনও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের বেঁচে থাকার আশা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে এই চরম বিপদের মুহূর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং জরুরি সেবা বিভাগের কর্মীরা সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

 

চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে সেনা সদস্যরা জম্মুর রাজৌরি জেলায় অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে একটি সফল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছেন। তারা বন্যার প্রবল স্রোতে আটকে পড়া পাঁচজন অবুঝ শিশুসহ অন্তত ১১ জনকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।

 

উদ্ধারকর্মীদের এই সাহসী তৎপরতা দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কায় ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে।

 

আবহাওয়া সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় জম্মু ও কাশ্মিরসহ এর পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, যা চলমান বন্যা পরিস্থিতিকে আরও কয়েকগুণ ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

 

এই চরম দুর্যোগময় ও ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে স্থানীয় প্রশাসন কাশ্মিরে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক হিন্দু তীর্থযাত্রা ‘অমরনাথ যাত্রা’ সাময়িকভাবে স্থগিত করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী ঘোষণা দিয়েছে। তীর্থযাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

 

প্রতি বছরই বর্ষাকালে মৌসুমী বৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা, মাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- এএফপি