মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ পার্টির পদযাত্রায় পুলিশের বাধা ও লাঠিচার্জ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ পার্টির পদযাত্রায় পুলিশের বাধা ও লাঠিচার্জ
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবন অভিমুখে আয়োজিত 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি-এর পূর্বঘোষিত একটি প্রতিবাদী পদযাত্রা পুলিশি হস্তক্ষেপে পণ্ড হয়ে গেছে। আজ সোমবার সকালে দিল্লির রাজপথে এই ঘটনা ঘটে, যখন বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মৃদু লাঠিচার্জ করে এবং পদযাত্রাটি সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র নয়াদিল্লি জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

 

গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা প্রদানের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার খবর প্রচার করছে।

 

এই তীব্র বিক্ষোভ ও ধারাবাহিক আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত ভারতের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি' বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো একটি অত্যন্ত গুরুতর কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে।

 

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অভিযোগ ওঠার পর থেকেই দেশটিতে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ওঠে।

 

একইসঙ্গে, এই কেলেঙ্কারির দায়ভার গ্রহণ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জুন থেকে রাজপথে নেমে আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকভিত্তিক আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি।

 

শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের এই যৌক্তিক আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ভারতের প্রখ্যাত জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুক গত ২৮ জুন থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেন, যা এই আন্দোলনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আরও বেশি দৃশ্যমান ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

 

পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ সোমবার সকালে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকা থেকে পার্লামেন্ট ভবন অভিমুখে একটি বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রা শুরু করার কথা ছিল ককরোচ জনতা পার্টির কর্মী ও অগণিত সমর্থকদের। সেই লক্ষ্যে তারা সকাল থেকেই নির্ধারিত স্থানে সমবেত হতে শুরু করেন।

 

কিন্তু পদযাত্রা শুরু হওয়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য হঠাৎ করেই আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হন।

 

ভারতভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে বিক্ষোভকারীরা সামনে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের শক্ত হাতে বাধা দেয় এবং একপর্যায়ে মৃদু লাঠিচার্জ করে পুরো সমাবেশটিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

 

অবশ্য পুলিশ যে এমন কঠোর ও দমনমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গতকাল রোববার থেকেই একটি স্পষ্ট ধারণা ছিল। কারণ, ককরোচ জনতা পার্টির এই পদযাত্রা যেকোনো মূল্যে রুখতে রোববার থেকেই রাজধানী নয়াদিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়েছিল।

 

পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রায় ৫ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আধাসামরিক বাহিনী 'সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স' বা সিআরপিএফ মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

এমনকি আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কৌশলগত স্থানগুলোতে আগে থেকেই জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। প্রশাসনিক এই ব্যাপক প্রস্তুতির কারণেই আজকের এই পুলিশি অ্যাকশনটি খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না।

 

নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমগ্র এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ নম্বর ধারা জারি করা হয়েছিল, যা মূলত যেকোনো ধরনের বেআইনি জমায়েত ও বিক্ষোভকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে।

 

দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী নেতাদের আগেই সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরের নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে আর কোথাও কোনো জমায়েত করা যাবে না এবং নতুন করে কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজনও সম্পূর্ণ বেআইনি বলে গণ্য হবে।

 

বিশ্বস্ত সূত্রের খবর অনুযায়ী, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা ছিল যে, সোমবারের অভিযানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র অবনতি বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তা যেন অত্যন্ত শক্ত হাতে দমন করা হয়।

 

পরিস্থিতি সরাসরি তদারকি করার জন্য দিল্লি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও আজ সকাল থেকেই রাজপথে উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, এর আগে ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এই বিশাল পদযাত্রা কর্মসূচির জন্য দিল্লি পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অনুমতি চাওয়া হয়েছিল।

 

কিন্তু সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যানজটের কথা বিবেচনা করে পুলিশ সেই অনুমতি প্রদান করেনি। পুলিশের প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বিনা অনুমতিতেই আজকের এই পদযাত্রা করার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আন্দোলনরত দলটি, যার ফলশ্রুতিতে আজকের এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির অবতারণা ঘটে।

 

এদিকে, দীর্ঘদিনের টানা অনশন ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে প্রখ্যাত আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুক বর্তমানে দিল্লির স্বনামধন্য সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তার শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

 

অন্যদিকে, যন্তর মন্তরে পুলিশের আজকের এই মৃদু লাঠিচার্জ ও পদযাত্রা ছত্রভঙ্গ করার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো বিক্ষোভকারীর গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের এই আন্দোলন আগামী দিনে ভারতের রাজনীতিতে আরও বড় কোনো প্রভাব ফেলে কি না এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মহল।

 

- এএনআই