এই শ্বাসরুদ্ধকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি উঠেছে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে। আন্দোলনকারী দলটির পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে যে, তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের প্রকৃত চিত্র, পুলিশের ভূমিকা ও মাঠপর্যায়ের ঘটনাপ্রবাহ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো ঠেকাতে সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের রাজধানীতে এ ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সোমবার সকাল থেকেই দিল্লির ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তর এলাকায় হাজারো সিজেপি সমর্থক জড়ো হতে শুরু করেন।
কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ অবস্থা প্রকাশ করতে চরম বাধার সম্মুখীন হয় দলটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের পক্ষে মাঠপর্যায়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
সিজেপি তাদের পোস্টে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখে যে, সাধারণ মানুষ যদি ভেবে থাকেন কেন তারা ঘটনাস্থল থেকে আরও বেশি হালনাগাদ তথ্য দিতে পারছেন না, তবে তার মূল কারণ হলো-কর্তৃপক্ষ শহরের বেশ কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
দলটির ভাষায়, এটি কর্তৃপক্ষের একটি অত্যন্ত ‘কাপুরুষোচিত’ পদক্ষেপ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আরও জানিয়েছেন যে, রাজধানী দিল্লির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হওয়ার অসংখ্য অভিযোগ তাদের কাছে প্রতিনিয়ত পৌঁছাচ্ছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে সাধারণ নাগরিকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। উদ্ভূত এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের হাজারো সমর্থককে পুলিশের যেকোনো ধরনের উসকানি বা বলপ্রয়োগের মুখে শান্ত ও অহিংস থাকার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
সিজেপি তাদের অপর এক বার্তায় কর্তৃপক্ষের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মন্তব্য করে যে, কর্তৃপক্ষ হয়তো সাময়িকভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে পারে, কিন্তু রাজপথে নেমে আসা এই হাজারো বিক্ষোভকারীর চোখ ও কান তারা কীভাবে বন্ধ করবে?
বিক্ষোভকারীরা নিজেদের চোখে আজ যা দেখছেন, তা যেকোনো মূল্যে পুরো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেবেন বলে দলটি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। একই দিনে দলের প্রধানকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাটি এই চলমান বিক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এদিকে, ককরোচ জনতা পার্টির এই ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিকে ঘিরে নয়াদিল্লিজুড়ে এক নজিরবিহীন ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আগে থেকেই ওই এলাকায় প্রশাসনিকভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল, তা সত্ত্বেও বিশাল এই জনসমুদ্র যখন সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে, তখন পরিস্থিতি অতি দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে।
বিক্ষোভকারীদের থামাতে যন্তর মন্তর ও পার্লামেন্ট স্ট্রিটসহ সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের সশস্ত্র সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারী তরুণ ও শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশের দেওয়া ভারী ব্যারিকেড ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের সরাসরি ও তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
দিল্লি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে ককরোচ জনতা পার্টিকে তাদের প্রস্তাবিত ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির জন্য কোনো ধরনের আইনি অনুমতি প্রদান করা হয়নি।
এছাড়া, স্পর্শকাতর নিউ দিল্লি জেলায় আগে থেকেই সব ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। পুলিশ কেবল তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তবে, আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আনা ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে দিল্লি পুলিশ বা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। গণতান্ত্রিক পরিসরে প্রতিবাদের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই দ্বন্দ্ব বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রয়েছে।