মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের কানপুরে স্বর্ণপদকজয়ী মেধাবী প্রকৌশলীর মর্মান্তিক আত্মহত্যা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

ভারতের কানপুরে স্বর্ণপদকজয়ী মেধাবী প্রকৌশলীর মর্মান্তিক আত্মহত্যা
ছবি : NDTV

অসামান্য মেধা, চমৎকার শিক্ষাজীবন এবং রাজ্যপালের হাত থেকে গ্রহণ করা সম্মানজনক স্বর্ণপদক-এসব কিছুও যেন বাস্তব জীবনের কঠিন লড়াইয়ে এক মেধাবী তরুণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তীব্র প্রতিযোগিতা ও চরম বেকারত্বের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে অবশেষে আত্মহননের মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হলেন ভারতের এক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ প্রকৌশলী।

 

মাত্র ২৩ বছর বয়সী এই তরুণের নাম আনন্দ কুমার। শিক্ষাজীবনে রাজ্যের অন্যতম শীর্ষস্থান অধিকারী এই তরুণ গত শনিবার উত্তরপ্রদেশের কানপুরে নিজ বাসভবনে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।

 

তার এই অকাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ভারতের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ চাকরির বাজার এবং যুবসমাজের ক্রমবর্ধমান মানসিক হতাশার এক করুণ চিত্রকে যেন নতুন করে উন্মোচিত করেছে।

 

কানপুরের গোবিন্দ নগর এলাকায় অবস্থিত তিনতলা পারিবারিক বাসভবনে ঘটনার দিন আনন্দ কুমার একেবারেই একা ছিলেন। তার পরিবারের অন্য সদস্যরা বড় ভাইয়ের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে বিহারের পৈতৃক বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

 

শনিবার সকালে বাড়ির পরিচারিকা যথারীতি কাজে এসে আনন্দের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পান। দীর্ঘক্ষণ ধরে বারবার কড়া নাড়ার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না মেলায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেশীদের বিষয়টি অবহিত করেন।

 

পরিস্থিতি সন্দেহজনক হওয়ায় প্রতিবেশীরা কালবিলম্ব না করে স্থানীয় পুলিশকে খবর দেন। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘরের দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় আনন্দ কুমারের নিথর দেহ উদ্ধার করে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরপরই পুরো এলাকায় এক গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। মরদেহ উদ্ধারের সময় পুলিশ আনন্দের ঘর থেকে নিজ হাতে লেখা পাঁচ লাইনের একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী সুইসাইড নোট বা আত্মহত্যার চিরকুট উদ্ধার করে।

 

সেই চিঠিতে জীবনের প্রতি চরম হতাশা এবং ব্যর্থতার গ্লানি থেকে পিতার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এই মেধাবী তরুণ। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘স্যরি বাবা, আমি সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্য প্রায় ৫০ বার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সফল হতে পারিনি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিও।’

 

মাত্র কয়েকটি বাক্যের এই চিঠিটি যেন চাকরিপ্রত্যাশী অসংখ্য তরুণের দীর্ঘশ্বাসের এক করুণ প্রতিধ্বনি, যা রাষ্ট্রের বেকারত্ব সংকটের ভয়াবহতাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আনন্দ কুমারের শিক্ষাজীবনের পরিসংখ্যান দেখলে যে কারও চোখ বিস্ময়ে আটকে যাবে।

 

তিনি ২০২৪ সালে কানপুরের স্বনামধন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘প্রাণবীর সিং ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিটেক) স্নাতক সম্পন্ন করেন। নিজের কলেজে তিনি মেধার ভিত্তিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন এবং সমগ্র উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের মধ্যে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়।

 

এমন অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি বিশেষ সম্মাননা অনুষ্ঠানে খোদ উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল আনন্দীবেন প্যাটেল তার হাতে সম্মানজনক স্বর্ণপদক তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, এই অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য এবং অভাবনীয় মেধার স্বীকৃতি তাকে একটি নিশ্চিত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

 

নিহত আনন্দের বাবা রাজকুমার একটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। ছেলের এমন করুণ পরিণতিতে তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। শোকাহত এই পিতা গণমাধ্যমের কাছে জানান যে, স্নাতক সম্পন্ন করার পর আনন্দ নিজেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য নিবিড়ভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেন।

 

এর আগে তিনি ভারতের পাওয়ার গ্রিডে এক বছরের শিক্ষানবিশি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপও সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। রাজকুমার অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে বলেন, ‘আনন্দ রেলওয়ে, স্টাফ সিলেকশন কমিশন (এসএসসি), ব্যাংক এবং শিক্ষা দপ্তরের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরি পাওয়ার আশায় অন্তত পঞ্চাশবার অংশগ্রহণ করেছিল।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে কোনোটিতেই চূড়ান্ত সফলতা পায়নি। গত বেশ কয়েক মাস ধরে সে এই বেকারত্ব নিয়ে প্রচণ্ড মানসিক টানাপোড়েন ও হতাশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।’ এই মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে গোবিন্দ নগর থানার স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) অশোক কুমার দুবে সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক তদন্তে সুস্পষ্টভাবে অনুমান করা হচ্ছে যে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত সরকারি চাকরি না পাওয়ার তীব্র মানসিক চাপ ও হতাশা থেকেই আনন্দ কুমার এমন চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

 

তবে পুলিশ এই আত্মহত্যার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ বা প্ররোচনা আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ঘটনার সব দিক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে। একজন স্বর্ণপদকজয়ী প্রকৌশলীর এমন করুণ মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং এটি ভারতের মতো জনবহুল দেশের বেকারত্ব সমস্যার এক বিশাল ও গভীর ক্ষতকে উন্মোচিত করেছে।

 

লাখ লাখ তরুণ যখন একটি সরকারি চাকরির আশায় নিজেদের যৌবনের সোনালী সময়গুলো পার করছেন, তখন আনন্দ কুমারের এই মর্মান্তিক বিদায় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে এক বিরাট ও অমীমাংসিত প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে গেল।

 

- এনডিটিভি