উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বিক্ষোভের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সোমবার দলটির পূর্বঘোষিত পার্লামেন্টমুখী পদযাত্রায় পুলিশি বাধা ও লাঠিচার্জের ঘটনার পর এই ঘোষণা আসে।
সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় দলের এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও এএনআই-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে দেওয়া ওই বিবৃতিতে সৌরভ দাস উল্লেখ করেন, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তিনি দুপুর থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার বাসভবনে অবস্থান করছেন। সেখানে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ অথবা তাকে বরখাস্ত করাসহ আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের দাবিগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং যথাযথ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যকর প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
ফলশ্রুতিতে, দাবি সম্পূর্ণভাবে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা রাজপথ ছাড়বেন না এবং কোনো অবস্থাতেই ঘরে ফিরবেন না বলে দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিবৃতির ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, সোমবার সকালে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তর এলাকা থেকে দেশটির পার্লামেন্ট ভবন অভিমুখে একটি বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল সিজেপি।
সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজিত এই শান্তিপূর্ণ পদযাত্রাটি শুরুর কিছুক্ষণ পরেই ব্যাপক পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। ভারতভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএনআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আকস্মিকভাবে লাঠিচার্জ শুরু করে।
এর আগে ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য দিল্লি পুলিশের কাছে দাপ্তরিক অনুমতির আবেদন করা হয়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে পুলিশ এই সমাবেশের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
পরবর্তীতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি সফল করার সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনটি, যার জের ধরে সকালে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চলমান এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল গত জুনের শুরুতে।
ভারতের সম্মানজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এনআইআইটি-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মারাত্মক কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু তদন্ত এবং এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দ্রুত পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জুন থেকে রাজপথে নামে ফেসবুকভিত্তিক জনমত থেকে গড়ে ওঠা সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি।
দিন যত গড়িয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িত এই আন্দোলন তত বেশি জোরালো ও সামাজিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। এই ন্যায়সংগত আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে গত ২৮ জুন থেকে ভারতের প্রখ্যাত জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনাম ওয়াংচুক আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেছেন।
তার এই অন্তর্ভুক্তি আন্দোলনটিকে একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মতো একটি বিশাল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনৈতিক ঘটনার কারণে লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যা দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর লাঠিচার্জ ও কঠোর দমনপীড়নের নীতি ক্ষোভ কমানোর পরিবর্তে আন্দোলনকারীদের আরও বেশি সংক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ের এই লড়াইয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে একটি স্বচ্ছ তদন্ত ও গঠনমূলক সংলাপের আয়োজন করা না হলে, এই আন্দোলন আগামী দিনগুলোতে আরও ব্যাপক রূপ ধারণ করতে পারে, যা দিল্লির সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিতিশীল করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করছে।