এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করেছেন দিল্লি হাইকোর্ট। একটি জনস্বার্থ পিটিশনের শুনানিকালে আদালতের মহামান্য বিচারকরা পুলিশের কাছে সুস্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছেন যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বেঁধে দেওয়া গোপনীয়তার অধিকার ও নজরদারি সংক্রান্ত নির্দেশিকাগুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না।
সোমবার, ২০ জুলাই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আদালত সূত্রে জানা যায়, দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় সিজেপির উদ্যোগে আয়োজিত লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বিক্ষোভকারীদের ওপর রাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত নজরদারির অভিযোগে এই আবেদনটি দায়ের করা হয়।
সোমবার দিল্লি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি. কে. উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ বেঞ্চে এই স্পর্শকাতর বিষয়টির ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিকালে আদালত সরাসরি পুলিশের কাছে জানতে চান, তারা নজরদারি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনাগুলো সম্পর্কে অবগত কি না।
সরকারের পক্ষে আদালতে উপস্থিত থাকা সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে বিচারকরা সরাসরি প্রশ্ন করেন যে, দিল্লি পুলিশ কি সেই আইনি নির্দেশনাগুলো অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছে?
এই আইনি বিতর্কের মূলে রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের একটি যুগান্তকারী রায়। ওই ঐতিহাসিক রায়ে সর্বোচ্চ আদালত সর্বসম্মতিক্রমে গোপনীয়তাকে ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সুরক্ষিত ‘জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার’-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
ওই রায়ে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, যেকোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় নজরদারি অবশ্যই আইনসম্মত, একান্ত প্রয়োজনীয় এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে আনুপাতিক হতে হবে। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আয়োজিত কোনো শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই বলে সেই রায়ে কড়া সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল।
হাইকোর্টে এই গুরুত্বপূর্ণ পিটিশনটি দায়ের করেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের (জেএনইউএসইউ) সাবেক সভাপতি ও বর্তমান অধিকারকর্মী ঐশী ঘোষ। তার দায়ের করা আবেদনে অত্যন্ত গুরুতর ও সংবেদনশীল কিছু অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
আবেদনে দাবি করা হয়, গত ২০ জুন থেকে যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিয়ত ছবি তোলা হচ্ছে এবং অবিরাম ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, একটি স্থায়ী নজরদারি টাওয়ার বা পর্যবেক্ষণ মিনার স্থাপন করে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা আন্দোলনকারীদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।
ঐশী ঘোষ তার আবেদনে আরও উল্লেখ করেন যে, পুলিশের এই নজরদারি কেবল বিক্ষোভের মূল মঞ্চ বা স্লোগান দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং আন্দোলনকারীদের স্বাভাবিক ও দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোও বেআইনিভাবে ক্যামেরাবন্দি করা হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে তাদের খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রামের সময় এবং চিকিৎসা সহায়তা নেওয়ার মতো নিতান্তই ব্যক্তিগত কার্যকলাপ। আবেদনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটিতে নারী আন্দোলনকারীদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পিটিশনে দাবি করা হয়েছে, বৃষ্টির কারণে যখন নারী বিক্ষোভকারীদের পোশাক ভিজে যায়, তখনো অত্যন্ত অমানবিক ও আপত্তিকরভাবে তাদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত অধিকারের নগ্ন লঙ্ঘনই নয়, বরং চরম অবমাননাকর একটি পদক্ষেপ হিসেবেও আদালতে তুলে ধরা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপকে মৌলিক মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তবে শুনানিকালে সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই নজরদারির যাবতীয় অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন।
তিনি আদালতের সামনে দাবি করেন যে, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পুলিশ কোনো ধরনের বেআইনি নজরদারি চালাচ্ছে না। তার ভাষ্যমতে, যন্তর মন্তরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় যেকোনো বিক্ষোভ কর্মসূচিই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে নিয়মিতভাবে রেকর্ড করা হয়ে থাকে। এটি পুলিশের একটি প্রাত্যহিক রুটিন কাজ।
তিনি আরও যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী শত শত আন্দোলনকারী নিজেরাই নিজেদের মোবাইল ফোনে প্রতিনিয়ত ভিডিও ও রিল তৈরি করছেন। পুলিশের ভিডিও ধারণের বিষয়টি কেবলই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, এখানে আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের কোনো হীন উদ্দেশ্য নেই।
দিল্লি হাইকোর্ট উভয় পক্ষের প্রাথমিক যুক্তিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শোনার পর বিষয়টির সংবেদনশীলতা অনুধাবন করে পরবর্তী শুনানির জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন। আগামীকাল এই বিষয়ে বিস্তারিত আইনি বিশ্লেষণ ও পুনরায় শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
এই শুনানির ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার কতটুকু সুরক্ষিত থাকবে। পুরো ভারতের আইনি অঙ্গন এবং মানবাধিকার কর্মীরা এখন এই মামলার চূড়ান্ত নির্দেশনার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।