উদ্ভূত সংকট নিরসনে রাজধানী নয়াদিল্লিতে আন্দোলনকারী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাবেক সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডার সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন।
দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা এবং এই বিষয়ে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিতে যখন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রায় শামিল হয়েছেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংকট ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও বর্তমান প্রশাসনের স্বচ্ছতাকে এক বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বৈঠকের পর ককরোচ জনতা পার্টির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা গণমাধ্যমকে জানান, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে তাদের আলোচনা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং জোরালো ছিল।
প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের কাছে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। তাদের প্রথম দাবিটি হলো, চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করায় আটক প্রখ্যাত পরিবেশ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের নিঃশর্ত ও দ্রুত মুক্তি নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, নিট পরীক্ষার এই নজিরবিহীন জালিয়াতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নৈতিক দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ অথবা তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে অপসারণ করা।
এবং তৃতীয় ও সবচেয়ে সংবেদনশীল দাবিটি হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই অনৈতিক ঘটনার পর চরম হতাশায় ও মানসিক অবসাদে ভুগে যেসকল মেধাবী পরীক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, তাদের প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এক কোটি রুপি করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা আরও উল্লেখ করেন যে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাদের এই সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শুনেছেন। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার জন্য তিনি কিছুটা সময় চেয়েছেন।
একই বিষয়ে দলের আরেক প্রভাবশালী মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, সরকারের উচ্চপর্যায়ে দাবিগুলো উত্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট বা লিখিত প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
ফলশ্রুতিতে, তাদের এই তিন দফা দাবি সম্পূর্ণরূপে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে এই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন অবিরামভাবে চলবে বলে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন। তবে একটি ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে সৌরভ দাস বলেন যে, আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে জেপি নাড্ডা আশ্বাস দিয়েছেন যে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এবং এর আশপাশের এলাকায় অবস্থান ধর্মঘটে থাকা সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে আর কোনো নতুন দমনমূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
অন্যদিকে, এই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈঠকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনাটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত স্মারকলিপি তার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের সামগ্রিক শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি তাদের চলমান অবস্থান কর্মসূচি সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার এবং রাজধানীতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন।
এই আলোচনার সমান্তরালে, দেশের প্রশাসনিক অন্দরেও এক তীব্র চঞ্চলতা লক্ষ্য করা গেছে। চলমান এই দেশব্যাপী তীব্র বিক্ষোভের মধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সরকারি বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে একটি দীর্ঘ ও গোপন বৈঠকে মিলিত হন।
যদিও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে ঠিক কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বা প্রশ্ন ফাঁসের তদন্তে কোনো নতুন মোড় এসেছে কি না, তা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, রাজপথের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তাল ও থমথমে। সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রায় অংশ নেওয়া শত শত সাধারণ শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী পুলিশের কঠোর ব্যারিকেড ও বাধা সত্ত্বেও মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করে দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তর এবং এর আশপাশের সমগ্র এলাকা থেকে বিক্ষোভকারীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকা এই সংবেদনশীল ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে থিতিয়ে যাওয়ার নয়। সরকার যদি অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একটি স্বচ্ছ, অর্থবহ ও ফলপ্রসূ সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ছাত্র অসন্তোষ আগামী দিনগুলোতে আরও ব্যাপক ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।