বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র আয়োজিত 'সংসদ চলো' পদযাত্রায় আন্দোলনকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্মম বলপ্রয়োগের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকের দাবি, পুলিশের উপর্যুপরি লাঠিচার্জের মুখে পড়ে এক তরুণী অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অনভিপ্রেত বলে উড়িয়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ প্রশাসন। তাদের পাল্টা বক্তব্য, আন্দোলনকারীদের সহিংস আচরণের ফলে বহু সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় স্তরের এই গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে বর্তমানে উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার বিস্তারিত তথ্যে জানা গেছে, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত আন্দোলনকারীদের দেখতে যান।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি পুলিশের নির্মম ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ন্যায়সংগত আন্দোলনের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসা নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিতে বেধড়ক লাঠিচার্জ চালিয়েছে পুলিশ।
এতে বহু তরুণী এবং কিশোরী শিক্ষার্থী মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে এক তরুণী মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাত পেয়ে বর্তমানে আরএমএল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন বলে দাবি করেন এই রাজনৈতিক নেতা।
ঘটনার পর তিনি নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় আন্দোলনকারীদের ওপর নেমে আসা এই সহিংসতার প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ওই বার্তায় অভিজিৎ দীপক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসা তরুণ ও নারী আন্দোলনকারীদের সঠিক সুরক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করছেন। তিনি সর্বান্তঃকরণে আহত সকল শিক্ষার্থী ও নেতাকর্মীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
একই সঙ্গে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, পুলিশের এই ধরনের দমন-পীড়ন চালিয়ে শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। তাদের বঞ্চনার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত রাজপথের এই লড়াই থামবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাধীন প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিবাদ মিছিলে অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থীও মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন বলে রাজনৈতিক দলটি দাবি করেছে।
অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সিজেপি নেতৃত্বের করা সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে জারি করা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো অধিকাংশ তথ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর।
বিশেষ করে গীতাঞ্জলি নামের বারো বছর বয়সী এক কিশোরীকে পুলিশ লাঞ্ছিত করেছে, তার চুল ধরে টানা-হেঁচড়া করা হয়েছে কিংবা কয়েক ডজন আন্দোলনকারীর মাথা ফেটে গুরুতর জখম হওয়ার যেসব খবর বা ছবি প্রচার করা হচ্ছে, তার কোনো সত্যতা নেই।
পুলিশ দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় তারা সংযমের পরিচয় দিয়েছে। তবে আন্দোলনের নামে একদল সহিংস পদযাত্রী বলপূর্বক ব্যারিকেড ভেঙে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে হাতাহাতির সূচনা হয়।
এই সংঘর্ষে অন্তত ১১৮ জনেরও বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রশাসন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দিল্লির সংসদ মার্গ এবং তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা দমন বাহিনী মোতায়েন করার পাশাপাশি রাস্তার মোড়ে মোড়ে কাঁটাতারের ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুরো এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
অন্যদিকে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্দোলনরত বেশ কয়েকজন জখম ব্যক্তি প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ভর্তি রেখে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে, তবে তাদের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন স্থগিত রেখে আলোচনার টেবিলে বসার আবেদন জানানো হলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুনির্দিষ্ট সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেছে সিজেপি।