মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিট প্রশ্নফাঁস রোধ জাতীয় দায়িত্ব, হুঁশিয়ারি মোদির

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

নিট প্রশ্নফাঁস রোধ জাতীয় দায়িত্ব, হুঁশিয়ারি মোদির
ছবি : Collected

ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাশাস্ত্রের স্নাতক পর্যায়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিতর্ক ও অস্থিরতার মাঝে এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

 

দেশব্যাপী লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক জালিয়াতির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

 

প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পবিত্রতা রক্ষা করা এবং এ ধরনের জালিয়াতি সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের কাজ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ও সর্বজনীন জাতীয় দায়িত্ব।

 

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ক্ষমতাসীন এনডিএ (ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স) সংসদীয় দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠক শেষে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন।

 

গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে ব্রিফিংকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন, সর্বাধুনিক, স্বচ্ছ ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা পদ্ধতি গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

এই বিশাল ও মহৎ লক্ষ্য অর্জনে তিনি দলমত নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমান সংসদীয় অধিবেশনে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক আইন প্রণয়ন ও সংস্কারমূলক কাজে পূর্ণ সমর্থন প্রদানের জন্য এনডিএ জোটের সকল শরিক দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ থাকার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি, বিরোধী দলগুলোর প্রতিও তিনি দেশের স্বার্থে এক গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর মতে, একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের মধ্যে রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্য থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু যখন প্রশ্ন ওঠে দেশের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং বিশাল যুবসমাজের সার্বিক কল্যাণের, তখন সেই ক্ষুদ্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে একটি বৃহত্তর যৌথ দায়িত্ববোধ থেকে সকল সংসদ সদস্যের একযোগে কাজ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

 

প্রধানমন্ত্রীর এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এমন এক চরম সংবেদনশীল ও উত্তেজনাকর সময়ে সামনে এল, যার ঠিক এক দিন আগেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক নজিরবিহীন ছাত্র বিক্ষোভ ও পুলিশি ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটেছে।

 

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ভারতের নতুন সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করা শত শত ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর একটি বিশাল প্রতিবাদী মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যাপক বলপ্রয়োগ করতে হয়।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী অটুট রাখতে পুলিশকে একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জের মতো অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছিল।

 

শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নেমে আসা এই নিরপরাধ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এহেন কঠোর দমন-পীড়ন দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তুলেছে।

 

চলমান এই তীব্র ছাত্র বিক্ষোভের একেবারে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্বে রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামক একটি অভিনব, ব্যতিক্রমী ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে ওঠার পেছনের প্রেক্ষাপটটি ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

গত মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিকালে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার যুবকদের করুণ অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাদের ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ-এর সাথে তুলনা করেছিলেন বলে একটি গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

 

দেশের শীর্ষ আদালতের একজন বিচারপতির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যের পর দেশজুড়ে বেকার এবং চরম হতাশায় নিমজ্জিত তরুণ সমাজের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় এই সিজেপি।

 

বর্তমানে এই অভিনব প্ল্যাটফর্মের ব্যানারেই হাজার হাজার প্রতিবাদী শিক্ষার্থী নিট পরীক্ষাসহ দেশের বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সংঘটিত ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও আপসহীন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

একই সাথে তারা এই চরম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

 

তবে বিক্ষোভকারীদের এই তীব্র দাবির মুখে ভারত সরকারের তরফ থেকে এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা দৃঢ়তার সাথে দাবি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হুবহু উদ্ধৃত করে চরম উৎকণ্ঠায় থাকা দেশবাসীকে এই মর্মে আশ্বস্ত করেছেন যে, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের স্পর্শকাতর খবরটি প্রকাশ্যে আসার প্রায় সাথে সাথেই সরকার অত্যন্ত তৎপরতার সাথে প্রয়োজনীয় সকল আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

 

এই নজিরবিহীন মেধা জালিয়াতির সাথে জড়িত মূল হোতা ও চক্রের সদস্যদের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চিহ্নিত করে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।

 

এছাড়া, মন্ত্রী আরও যোগ করেন যে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে কোনো নিরপরাধ ও মেধাবী শিক্ষার্থীর মূল্যবান ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত না হয়, তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে একটি স্বচ্ছ পুনঃপরীক্ষা গ্রহণের সুব্যবস্থাও করা হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে, শিক্ষাক্ষেত্রে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা রক্ষায় সরকার যে বিন্দুমাত্র আপস করতে রাজি নয়, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এই কড়া বার্তায় তারই সুস্পষ্ট ও জোরালো প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষকরা।

 

- এনডিটিভি