মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কলকাতায় ‘শহীদ দিবস’ মঞ্চে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর, রাতভর পাহারায় মমতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম

কলকাতায় ‘শহীদ দিবস’ মঞ্চে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুর, রাতভর পাহারায় মমতা
ছবি : Collected

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে ২১শে জুলাই একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও ঐতিহাসিক দিন হিসেবে পরিগণিত হয়। ১৯৯৩ সালের এই দিনে পুলিশের গুলিতে নিহত ১৩ জন রাজনৈতিক কর্মীর স্মরণে প্রতি বছর কলকাতায় ‘শহীদ দিবস’ পালন করা হয়।

 

তবে এবারের শহীদ দিবস পালনের প্রস্তুতি পর্বে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনার সাক্ষী হলো কলকাতা শহর। সোমবার দিবাগত রাতে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসারীদের তৈরি করা শহীদ দিবসের মূল মঞ্চে অতর্কিতে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে।

 

এই ঘটনার খবর পেয়ে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মধ্যরাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে তিনি সারারাত সেই মঞ্চ নির্মাণস্থলেই অবস্থান করেন।

 

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মঙ্গলবার মূল স্মরণসভায় তাঁর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। কলকাতার বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম বা তারামণ্ডল সংলগ্ন এলাকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস এই বছর শহীদ দিবসের মঞ্চ তৈরি করছিল।

 

দলীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, সোমবার রাত আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামধারী একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি অতর্কিতে সেখানে আক্রমণ চালায়। তারা মঞ্চের সামনে লাগানো পোস্টার, ব্যানার এবং ফ্লেক্স ছিঁড়ে ফেলে পুরো আয়োজনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

 

সেসময় মঞ্চ প্রস্তুতির কাজে নিয়োজিত সাধারণ কর্মীদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধর করা হয় বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই শহীদ দিবসের প্রেক্ষাপট মূলত তিন দশকের পুরোনো এক রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।

 

১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেসের অঙ্গসংগঠন যুব কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সচিবালয় ‘মহাকরণ’ বা রাইটার্স বিল্ডিং অভিমুখে এক প্রতিবাদী পদযাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, নির্বাচনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা।

 

যুব কংগ্রেসের তৎকালীন রাজ্য সভাপতি মমতার নির্দেশেই এই মহাকরণ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের সময় পুলিশের নির্বিচার গুলিতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী প্রাণ হারান। সেসময় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বামফ্রন্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

 

প্রশাসনে ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার তুষার কান্তি তালুকদার। সেদিনের সেই নির্মম গুলি চালানোর ঘটনার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৎকালীন বামফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকারকেই দায়ী করে এসেছে।

 

রাজনৈতিক মহলে দাবি রয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের নির্দেশেই পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। পরবর্তীকালে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর ৪ঠা নভেম্বর সাবেক বিচারপতি সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেন।

 

কমিশন মোট ৪৪ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করেছিল। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, সোমেন মিত্র, প্রদীপ ভট্টাচার্য, মণীশ গুপ্ত এবং তুষার কান্তি তালুকদার উপস্থিত ছিলেন। তবে আন্দোলনের মূল নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়নি।

 

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তদন্ত কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি। তবে সম্প্রতি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বিধানসভায় পেশ করেছেন।

 

এই ঐতিহাসিক দিনটিকে কেন্দ্র করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মমতাকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, একুশে জুলাইয়ের আবেগ এবং শহীদদের রক্ত ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাজনৈতিক আখের গুছিয়েছেন।

 

কিন্তু যাদের আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করে এই রাজনৈতিক উত্থান, সেই শহীদ পরিবারগুলো আজও চরম উপেক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই মূলত ২১শে জুলাইকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত বড় পরিসরে পালন করে আসছে দলটি।

 

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিহতদের পরিবারকে মূল মঞ্চে এনে ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে এই সমাবেশের আয়োজন করা হতো। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম পরাজয় এবং দলটিতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেওয়ায় শহীদ দিবস পালনের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট বিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

একসময়ের ঐক্যবদ্ধ তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে তিন টুকরো হয়ে যাওয়ায় এবার চারটি ভিন্ন দলের ব্যানারে শহীদ দিবস পালিত হচ্ছে। কালীঘাটের অনুগত তৃণমূল অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহী তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলটির একাংশ কলকাতার মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে দিনটি পালন করছে।

 

পাশাপাশি মূল জাতীয় কংগ্রেস কলকাতার ধর্মতলায় শহীদ মিনার ময়দানের পাদদেশে পৃথকভাবে স্মরণসভার আয়োজন করেছে। একসময়ের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক আবেগের এই দিনটি এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিভেদের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- ইত্তেফাক