মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেষ্টনী ভেঙে ভারতের সংসদের দোরগোড়ায় হাজারো বিক্ষোভকারী, নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

বেষ্টনী ভেঙে ভারতের সংসদের দোরগোড়ায় হাজারো বিক্ষোভকারী, নিয়ন্ত্রণে পুলিশের লাঠিচার্জ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক নজিরবিহীন ও অভাবনীয় বিক্ষোভের সাক্ষী হলো গোটা দেশ। কড়া নিরাপত্তাবলয়, কয়েক স্তরের ব্যারিকেড এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার মতো কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর এক বিশাল জনস্রোত ভারতের পার্লামেন্ট বা সংসদ ভবনের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

 

সোমবার ভারতীয় সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই এমন একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে, যা রাজধানী দিল্লির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

মূলত শিক্ষার্থী এবং তরুণদের নিয়ে গঠিত এই বিশাল বিক্ষোভকারী দল অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তর থেকে তাদের প্রতিবাদী যাত্রা শুরু করে এবং প্রশাসনের সব ধরনের বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে রাইসিনা মার্গ হয়ে সরাসরি সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়।

 

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নিশ্ছিদ্র প্রহরার দাবিকে কার্যত ম্লান করে দিয়ে তারুণ্যের এই বাঁধভাঙা জনস্রোত একপ্রকার অপ্রতিরোধ্য গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'দ্য হিন্দু' এবং এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রাজধানী দিল্লির অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই এলাকাটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে আগে থেকেই প্রায় তিন হাজার সুসজ্জিত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

শুধু তা-ই নয়, বিক্ষোভকারীদের পদযাত্রা যেকোনো মূল্যে আটকে দেওয়ার জন্য রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে কয়েক স্তরের মজবুত ব্যারিকেড বা প্রতিবন্ধকতারও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্দীপ্ত তারুণ্যের এই প্রবল জোয়ারের সামনে সেই সমস্ত নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ একেবারেই অকার্যকর ও ভঙ্গুর প্রমাণিত হয়।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল জনসমুদ্রের কোনো সুনির্দিষ্ট বা দৃশ্যমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন এই স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোত যখন ঐতিহ্যবাহী যন্তর মন্তর থেকে রাইসিনা মার্গের দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ বা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে তেমন কোনো জোরালো বা কার্যকর প্রতিরোধের সম্মুখীন তাদের হতে হয়নি।

 

বিক্ষোভকারীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সংসদের দিকে যাওয়ার সমস্ত প্রধান সড়ক নিজেদের পূর্ণ দখলে নিয়ে নেয়। সেই সময় ওই সড়কগুলোতে কেবল মানুষের উপচে পড়া ভিড়ই চোখে পড়ছিল, যা সাধারণ মানুষের মনে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়।

 

পথে পুলিশ প্রশাসনের স্থাপন করা একাধিক শক্তিশালী ব্যারিকেড তারা অত্যন্ত অনায়াসেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এবং নিজেদের গন্তব্যের দিকে দৃপ্ত পদে এগিয়ে যেতে থাকে। এই অপ্রত্যাশিত ও বিপুলসংখ্যক মানুষের আকস্মিক উপস্থিতিতে সেখানে দায়িত্বে থাকা দিল্লি পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা আক্ষরিক অর্থেই চরম দিশেহারা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।

 

পরিস্থিতি ক্রমশ তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত চরম পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়। বিক্ষোভকারীদের এই উত্তাল জনসমুদ্র যখন পার্লামেন্ট কমপ্লেক্স বা সংসদ ভবনের অত্যন্ত কাছে চলে আসে, তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলপ্রয়োগের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

 

উন্মত্ত ও অগ্রসরমাণ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার লক্ষ্যে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। একই সঙ্গে শুরু হয় ব্যাপক ও নির্বিচার লাঠিচার্জ, যার ফলে পুরো এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে এক চরম আতঙ্কময় ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া এবং পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জের মুখে পড়ে বিক্ষোভকারীদের অনেকেই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন এবং এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করেন। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও অভিনব বিষয়টি ঘটে একেবারে শেষ মুহূর্তে।

 

পুলিশ যখন গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে যে সাধারণ ব্যারিকেড দিয়েও এই বিপুল জনস্রোত আটকানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না, তখন তারা তড়িঘড়ি করে বেশ কয়েকটি বড় আকারের যাত্রীবাহী বাস আড়াআড়িভাবে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

 

মূলত সংসদ ভবন থেকে মাত্র একশো মিটার দূরে বাস দিয়ে এই কৃত্রিম দেয়াল বা অস্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলে বিক্ষোভকারীদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো থেকে বিরত রাখার মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়।

 

এই নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও সংসদ ঘেরাওয়ের চেষ্টা ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে যখন দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হওয়ার কথা, ঠিক সেই মুহূর্তে সংসদের বাইরে এমন মাত্রার নিরাপত্তাহীনতা ও বিশৃঙ্খলা একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার মতো চরম পদক্ষেপ সাধারণত বিক্ষোভকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও জমায়েত প্রতিহত করার জন্যই নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই কৌশলও সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

 

দেশের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও ভয়ডরহীন অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ কতটা গভীর। পুরো পরিস্থিতি বর্তমানে থমথমে হলেও, দিল্লির রাজপথের এই অভাবনীয় ঘটনা আগামী দিনগুলোতে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এবং প্রশাসনিক মহলে যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

- দ্য হিন্দু