মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও সরব ভারতীয় তারকারা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও সরব ভারতীয় তারকারা
ছবি : Collected

ভারতের চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে দেশজুড়ে চলমান আন্দোলন এখন নতুন মোড় নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তরে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন ভারতের নতুন রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

 

এই ন্যায্য আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে গত ২৮শে জুন থেকে একই স্থানে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তবে গত শনিবার দিল্লি পুলিশ তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে স্থানীয় সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে।

 

এরপর গত সোমবার ভারতীয় লোকসভায় যখন চলতি বছরের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হয়, ঠিক সেই দিনেই ককরোচ জনতা পার্টি তাদের পূর্বঘোষিত ‘সংসদ চলো’ বা পার্লামেন্ট ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দেয়।

 

কিন্তু পুলিশ প্রশাসন এই শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচির কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি তো দেয়ইনি, উল্টো নিরীহ শিক্ষার্থীদের জমায়েত পণ্ড করতে তাদের ওপর নির্বিচারে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। শিক্ষার্থীদের এই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক সমাবেশের ওপর পুলিশের এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় ভারতজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের পাশাপাশি এই ঘটনার কড়া সমালোচনা করে রাজপথের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ভারতের প্রথিতযশা অভিনয়শিল্পী ও সেলিব্রেটিরা। সোমবার সংসদ অভিমুখে যাত্রার আগেই যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন প্রবীণ অভিনেত্রী শাবানা আজমি এবং বর্ষীয়ান অভিনেতা ও পরিচালক প্রকাশ রাজ।

 

এই আন্দোলন যে সম্পূর্ণ অহিংস এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সে কথা দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়ে শাবানা আজমি বলেন, যারা সেদিন সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তারা কেবল একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতেই এসেছিলেন।

 

দেশের সংবিধান নাগরিকদের এই অধিকার প্রদান করেছে। তিনি আরও বলেন, মহাত্মা গান্ধী তাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অহিংস পথে প্রতিবাদ করতে হয়, আর সেই সুমহান আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই তারা সেখানে সমবেত হয়েছিলেন।

 

কোনো ধরনের সহিংসতা ছড়ানোর বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য তাদের ছিল না, বরং একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃঢ় আশা নিয়েই তারা রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। শাবানা আজমির সেই আশার বাণী অবশ্য বাস্তবে রূপ নেয়নি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখলেও, পুলিশের অতর্কিত হামলায় পুরো পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে অশান্ত হয়ে ওঠে।

 

এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর পাঞ্জাবের জনপ্রিয় গায়ক ও অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি আবেগঘন বার্তায় লেখেন, যা ঘটেছে তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কখনোই এমন নির্দয় আচরণ করা উচিত নয়।

 

জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরকে স্রষ্টার কণ্ঠস্বর হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অভিযোগগুলো মনোযোগ সহকারে শোনার বিনীত অনুরোধ জানান।

 

অতীতের কৃষক আন্দোলনের সময় কৃষকদের পক্ষে কথা বলায় তাকে কীভাবে তথাকথিত ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়া হয়েছিল, সেই তিক্ত স্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই শিল্পী বলেন, অতীতে তাকে অনেক ভুগতে হয়েছিল এবং এবারও হয়তো তাকে একই ধরনের অপবাদের শিকার হতে হবে।

 

অন্যদিকে, তারকা দম্পতি রিতেশ দেশমুখ ও জেনেলিয়া ডি'সুজা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রতিবাদী তরুণদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, তারা দেশের যুবসমাজের পাশে আছেন। তরুণদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো রকম ভয়ভীতি ছাড়াই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শোনার সুযোগ দেওয়া হয়, সেই দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

এই দম্পতির মতে, তরুণেরাই যেকোনো প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের মূল স্পন্দন এবং আগামী দিনের রূপকার। তাই তরুণদের কথা শোনা, তাদের সমর্থন দেওয়া এবং ক্ষমতায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তরুণদের সাহস ও শক্তিই সেই কাঙ্ক্ষিত ভারত গড়ে তুলবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

বলিউড অভিনেত্রী হুমা কুরেশিও এই পুলিশি নিষ্ঠুরতায় গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি জানিয়েছেন, রাজপথের এই করুণ দৃশ্যগুলো তার স্মৃতিতে দীর্ঘকাল রয়ে যাবে। নিরীহ ও অহিংস প্রতিবাদকারীদের ওপর এমন নির্মম বলপ্রয়োগ এবং লাঠিচার্জের দৃশ্য দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত।

 

প্রখ্যাত চিত্রনাট্যকার সুতপা সিকদার শিক্ষার্থীদের এই অসহায় অবস্থার চিত্র তুলে ধরে লিখেছেন, এই আন্দোলনকারীদের অধিকাংশই সাধারণ শিক্ষার্থী, যাদের পকেটে হয়তো মাত্র ২০ টাকা সম্বল রয়েছে, কিন্তু বুকে রয়েছে এক বুক আশা। তারা মূলত কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন।

 

তারা কোনো বিত্তশালী বা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান নন বলেই হয়তো তাদের রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেনি। তিনি আরও জানান, এই তরুণেরা সারা জীবন বাস-ট্রেনের ভিড় ঠেলে, ভর্তি পরীক্ষার জন্য এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো খবরের অপেক্ষায় থেকে যে অবর্ণনীয় সংগ্রাম করে চলেছেন, রাজপথেও তারা সেই একই মানসিকতা নিয়ে অনড় অবস্থানে ছিলেন।

 

একই সুরে অভিনেত্রী ও স্বনামধন্য নির্মাতা নন্দিতা দাস মন্তব্য করেছেন, যারা বিশ্বাস করেন যে মানুষের স্বাধীনভাবে সমবেত হওয়া, কথা বলা এবং নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার মাধ্যমে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়, তিনি সর্বান্তঃকরণে তাদের পাশেই আছেন।

 

তার মতে, যেকোনো গঠনমূলক ভিন্নমতই মূলত গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। দিল্লিতে যারা একটি আদর্শ ভারতের জন্য লড়াই করছেন, নন্দিতা দাস মনে-প্রাণে তাদের সমর্থন করেন। পাশাপাশি অভিনেত্রী ভূমি পেদনেকর এক বার্তায় স্পষ্ট করে বলেছেন, সহিংসতা কখনো কোনো সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না।

 

তিনি শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটির কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু এরাই নন, সোনি রাজদান, জিনাত আমান, অভয় দেওল, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ, ওমি বৈদ্য এবং সোনাক্ষী সিনহাসহ আরও অনেক জনপ্রিয় তারকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নিজেদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 

তরুণ সমাজকে দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে সোনাক্ষী সিনহা তার বার্তায় লিখেছেন, হাজারো কষ্ট ও পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েও এই প্রতিবাদী তরুণেরা নিজেদের ন্যায্য দাবি ও বিশ্বাসে যেভাবে অবিচল রয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।