তবে মঙ্গলবার, ২১শে জুলাই, পাঞ্জাব রাজ্য থেকে শুরু হওয়া কৃষকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত যাত্রাপথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজধানীমুখী এই বিশাল জনস্রোতকে হরিয়ানা রাজ্যে প্রবেশের ঠিক মুখেই শম্ভু নামক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে সম্পূর্ণ আটকে দেওয়া হয়েছে।
এই অপ্রত্যাশিত ও কঠোর বাধার ফলে সীমান্ত এলাকায় চরম উত্তেজনা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কৃষক অসন্তোষের বিষয়টি পুনরায় সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে।
দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষকদের আটকাতে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই বিশাল ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয় এবং ব্যারিকেড স্থাপনের দৃশ্যটি সচেতন নাগরিকদের মনে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত ‘দিল্লি চলো-২’ নামক বৃহৎ কৃষক আন্দোলনের স্মৃতিই আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনছে।
সেই সময় ঠিক একইভাবে কৃষকদের যেকোনো মূল্যে দেশের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ও নির্দয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। সীমান্ত এলাকাটিকে কার্যত একটি অভেদ্য সামরিক দুর্গে পরিণত করতে তারা বড় বড় কংক্রিটের ব্লক, রাস্তায় ছড়ানো লোহার পেরেক এবং কয়েক স্তরের অত্যন্ত মজবুত ব্যারিকেড ব্যবহার করেছিল।
এবারও অধিকারকামী কৃষকদের আটকাতে ঠিক সেই একই রকম কঠোর, অনমনীয় ও দমনমূলক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। নিজেদের পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ না পেয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ কৃষকেরা শেষ পর্যন্ত শম্ভু সীমান্ত এলাকাতেই এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন।
এই সমাবেশ থেকে তারা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় দেশের রাজধানীতে গিয়ে নিজেদের ন্যায্য দাবিদাওয়া তুলে ধরার মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার জন্য হরিয়ানা এবং পাঞ্জাব-উভয় রাজ্যের প্রাদেশিক সরকারকেই কঠোরভাবে অভিযুক্ত করেন।
কৃষক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বিকেইউ শহীদ ভগৎ সিং-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা তেজভীর সিং এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, হরিয়ানা পুলিশ তাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পাঞ্জাবের নিজস্ব ভূখণ্ডের অনেকটা ভেতরে প্রবেশ করে এই বিশালাকার ব্যারিকেডগুলো তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে তিনি চরম হতাশা ব্যক্ত করে বলেন যে, পাঞ্জাব সরকার এই ধরনের আগ্রাসী ও অন্যায্য পদক্ষেপ প্রতিহত করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাই করেনি, বরং তারা সম্পূর্ণ নীরব ও নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
সংবাদমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শম্ভু সীমান্তে পাঞ্জাব থেকে আসা মূল কৃষকদের বহরগুলো কঠোরভাবে আটকে দেওয়া হলেও আন্দোলনের সামগ্রিক গতি কিন্তু পুরোপুরি থেমে যায়নি।
বরং আম্বালা, কুরুক্ষেত্র এবং এর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলাসহ হরিয়ানা রাজ্যের স্থানীয় কৃষকেরা যেকোনো মূল্যে দিল্লির উদ্দেশে তাদের প্রতিবাদী যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। মূলত ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ বা দেশ রক্ষার জোট নামক একটি বৃহত্তর ব্যানারের অধীনে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং হিমাচল প্রদেশের অসংখ্য ছোট-বড় কৃষক সংগঠনগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্রিত হয়েছে।
তাদের সবার অভিন্ন ও প্রধান দাবি হলো, দেশের কৃষি খাতকে বাঁচাতে কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রস্তাবিত এই অসম ও ধ্বংসাত্মক বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে হবে। আন্দোলনের বিস্তীর্ণ রূপরেখা ও চুক্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে কিষাণ মজদুর সংগ্রাম কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
তিনি জানান, পুলিশের বাধার কারণে শম্ভু সীমান্তে থেমে যাওয়ার আগে কেএমএসসি, কিষাণ মজদুর মোর্চা, আজাদ কিষাণ মোর্চা এবং বিকেইউ একতা সংগ্রাম নামক সংগঠনগুলোর বিশাল বহরগুলো সুশৃঙ্খলভাবে রাজধানীর অভিমুখে রওনা দিয়েছিল।
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি মোটেও আর দশটা সাধারণ ও প্রচলিত বাণিজ্য চুক্তির মতো নয়, বরং এটি অনেক বেশি সর্বগ্রাসী। এই চুক্তির ফলে ভারতের অতি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি খাত, দুগ্ধ উৎপাদন শিল্প, সাধারণ শিল্প খাত, ডিজিটাল বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয় খাত, মেধাস্বত্ব অধিকার এবং বিভিন্ন সেবা খাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে বিদেশি আধিপত্যের পথ পুরোপুরি প্রশস্ত হয়ে যেতে পারে।
বিক্ষোভরত কৃষক নেতারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলছেন যে, অতীতের বিভিন্ন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই ভারতের বাজারে তাদের পণ্যের জন্য শুল্ক কমানো এবং আমদানি বিধিনিষেধ শিথিল করার জন্য ধারাবাহিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে এসেছে।
বিশেষ করে সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, আপেল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য, পোলট্রি এবং মৎস্যপণ্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে তারা গভীর প্রবেশাধিকার চায়। কৃষকদের সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গাটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশের কৃষকদের বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি প্রদান করে থাকে।
এখন যদি সেই ভর্তুকিপ্রাপ্ত সস্তা মার্কিন কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের দেশীয় বাজার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তবে অসম এই প্রতিযোগিতায় ভারতের লাখ লাখ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল কৃষক একেবারেই টিকতে পারবেন না এবং তারা নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে পতিত হবেন।
পাশাপাশি, এই আন্তর্জাতিক চুক্তির আলোচনা প্রক্রিয়াকে ঘিরে যে চরম অস্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে, তা নিয়েও কৃষক নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ হলো, দেশ ও দশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রস্তাবিত চুক্তির কোনো বিস্তারিত বিবরণ বা শর্তাবলি এখন পর্যন্ত সাধারণ জনগণের সামনে প্রকাশ করা হয়নি।
কৃষক সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, ভারতের শুধু দুগ্ধ খাতটিই দেশের প্রায় আট কোটি গ্রামীণ পরিবারের প্রধান জীবিকা ও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। এই বিশাল খাতে বিন্দুমাত্র নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তা সমগ্র দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেবে।
এর ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের দুগ্ধ উৎপাদনকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিভিত্তিক দেশীয় শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ কারণেই ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি জানিয়েছে যে, দেশ ও কৃষকের বৃহত্তর স্বার্থে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তিসংক্রান্ত যাবতীয় গোপন নথি অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।