মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে পুলিশ ও ককরোচ জনতা পার্টির তুমুল সংঘর্ষ, ১১৮ পুলিশ আহত, গ্রেপ্তার ৭০

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

দিল্লিতে পুলিশ ও ককরোচ জনতা পার্টির তুমুল সংঘর্ষ, ১১৮ পুলিশ আহত, গ্রেপ্তার ৭০
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা গতকাল সোমবার এক নজিরবিহীন সংঘাত, চরম বিশৃঙ্খলা ও আক্ষরিক অর্থেই এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তরুণ ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে দিনভর দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

 

এই তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইটপাটকেল ও পাথরের আঘাতে অন্তত ১১৮ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের নেওয়া কঠোর পদক্ষেপে অন্তত ৬০ জন বিক্ষোভকারীও আহত হয়েছেন বলে সরকারিভাবে জানা গেছে।

 

সংঘাত, সরকারি কাজে সরাসরি বাধা প্রদান এবং ভাঙচুরের সুস্পষ্ট অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৭০ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ। এই অভূতপূর্ব গণ-অসন্তোষ ও রাজপথের উত্তাপের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর নিট বা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বহুল আলোচিত কেলেঙ্কারি।

 

লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী এই পরীক্ষায় নজিরবিহীন দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত এবং এর দায়ভার গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ই জুন থেকে রাজপথে টানা ও ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে তরুণ প্রজন্মের এই সংগঠনটি।

 

তাদের এই দীর্ঘস্থায়ী ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেই গতকাল সোমবার যন্তর মন্তর থেকে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা বা সংসদ ভবন অভিমুখে এক বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।

 

আন্দোলনকারীরা এই কর্মসূচির নাম দিয়েছিলেন ‘সংসদ চলো’। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দাবিতে হাজারো তরুণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিশদ বিবরণ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালে পূর্বনির্ধারিত সময়ে হাজারো বিক্ষোভকারী যখন তাদের ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রা শুরু করেন, তখন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়।

 

বিশাল এই জনস্রোতকে যেকোনো মূল্যে ছত্রভঙ্গ করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রাথমিক পর্যায়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মৃদু লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের এই আকস্মিক ও কঠোর বাধায় আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হলেও তাদের মনোবল ভাঙেনি।

 

কিছুক্ষণ পরেই তারা পুনরায় যন্তর মন্তর এলাকায় সংঘবদ্ধ হয়ে জমায়েত হতে থাকেন। তারা তাদের স্থগিত কর্মসূচি আবারও নতুন উদ্যমে শুরু করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের দ্বিতীয়বারের মতো কঠোরভাবে বাধা দিতে এগিয়ে আসে। আর ঠিক তখনই উভয় পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও সরাসরি সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে, যা পরবর্তীতে একটি ব্যাপক মাত্রার সহিংসতায় রূপ নেয়।

 

দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক দীর্ঘ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই পুরো সংঘাতময় ঘটনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিবৃতিতে ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারের যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, আন্দোলনরত তরুণরা একপর্যায়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে পুলিশের দিকে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ও পাথর নিক্ষেপ করতে থাকেন।

 

তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপন করা একাধিক স্তরের লোহার ও কংক্রিটের নিরাপত্তা ব্যারিকেড বারবার ভেঙে ফেলার চেষ্টা চালান। শুধু তাই নয়, সরকারি যানবাহন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করার পাশাপাশি তারা এমন এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন, যা দেশের রাজধানীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।

 

প্রশাসন মনে করে, এই ধরনের ধ্বংসাত্মক ও সহিংস আচরণ কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হতে পারে না। সংঘর্ষের ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা বর্ণনা করে পুলিশের ওই বিবৃতিতে আরও গভীরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আহত ১১৮ জনের অধিক পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে কেবল সাধারণ কনস্টেবল বা মাঠপর্যায়ের সদস্যরাই নন, বরং পুলিশের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছেন।

 

আহতদের এই দীর্ঘ তালিকায় দিল্লি পুলিশের বিশেষ কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, উপকমিশনার, অতিরিক্ত উপকমিশনার এবং সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যা এই সংঘাতের মাত্রা কতটা তীব্র ছিল তা প্রমাণ করে।

 

এছাড়া দায়িত্ব পালনরত বেশ কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্যও কর্তব্যরত অবস্থায় বিক্ষোভকারীদের এই অতর্কিত হামলার নির্মম শিকার হয়েছেন। তাদের অনেককেই রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

 

পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে আন্দোলনকারী তরুণদের আহত হওয়ার বিষয়টিও অকপটে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্যমতে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাধ্য হয়েই কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও ব্যাপক লাঠিচার্জ করেন, যার ফলে সিজেপির অন্তত ৬০ জন সমর্থক আহত হয়েছেন।

 

আহত পুলিশ সদস্য ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেককেই ঘটনাস্থলে ও স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে যাদের আঘাত তুলনামূলকভাবে গুরুতর, তাদের দ্রুত উদ্ধার করে নয়াদিল্লির বিভিন্ন নামকরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

 

দেশের রাজধানীর বুকে সংঘটিত এই অনাকাঙ্ক্ষিত, অভাবনীয় ও সহিংস ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে, যা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও তরুণদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আগামী দিনগুলোতে আরও বড় কোনো জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।