সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতিবাদী তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে আয়োজিত ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নজিরবিহীন হামলার পর এই রাজনৈতিক উত্তাপ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রকাশিত এক বিস্তৃত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজপথে পুলিশি হামলার মতো এত বড় একটি ঘটনার পরও প্রধানমন্ত্রী কেন এখনো নীরব ভূমিকা পালন করছেন, তা নিয়ে রাহুল গান্ধী সরাসরি ও কঠোর ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন।
একই সঙ্গে তিনি জোরালো দাবি করেছেন যে, গত সোমবার দিল্লির রাজপথে অধিকারকামী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে, তার দায়ভার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে অবশ্যই জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ যাদের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেই তরুণ সমাজ আজ নিজেদের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে রাজপথে পুলিশের নিষ্ঠুর মারধরের শিকার হচ্ছে, অথচ প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ নিশ্চুপ হয়ে আছেন।
তিনি অবিলম্বে মুখ খুলে সরকারের এই অযৌক্তিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক দমন-পীড়ন বন্ধ করার জোরালো আহ্বান জানান। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশি হামলায় আহত ও চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী মঙ্গলবার নয়াদিল্লির আরএমএল হাসপাতালে ছুটে যান।
সেখানে তারা শয্যাশায়ী আহত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন, তাদের চিকিৎসার খোঁজ নেন এবং তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে পূর্ণ সংহতি জ্ঞাপন করেন।
আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই সাক্ষাতের আগে মঙ্গলবার সকালে সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে রাহুল গান্ধী লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বৈঠকে মিলিত হন।
ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এই অমানবিক পদক্ষেপ এবং দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চরম জাতীয় সংকট নিয়ে সংসদে বিশদ ও জরুরি আলোচনার জোর দাবি উত্থাপন করেন।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় রাহুল গান্ধী তার এই বৈঠকের কথা নিশ্চিত করে লেখেন যে, বিরোধী দলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছেন।
তাদের মূল ও প্রধান দাবি অত্যন্ত সুস্পষ্ট; আর তা হলো নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো পুলিশের এই পৈশাচিক বর্বরতা এবং দেশের পরীক্ষাব্যবস্থায় যে নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পূর্ণ জবাবদিহির অভাব নিয়ে সংসদে বিস্তারিত, স্বচ্ছ ও অর্থবহ আলোচনা করতে হবে।
নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ ন্যায্য, যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক প্রশ্ন তোলায় যেভাবে শিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছে, তার তীব্র ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানিয়ে রাহুল গান্ধী প্রশ্ন রাখেন যে, ভারতের সর্বোচ্চ আইনসভা বা সংসদ যদি দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীনভাবে আলোচনাই করতে না পারে, তবে এই বিশাল ও ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের আসলে মূল উদ্দেশ্য কী?
তিনি এই পুরো বিষয়টিকে কোনোভাবেই ধামাচাপা পড়তে দেবেন না বলে দেশবাসীর কাছে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। কংগ্রেস নেতা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিরোধী দল দেশের অধিকারবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের এই ন্যায়সংগত লড়াই যেকোনো মূল্যে অব্যাহত রাখবে।
রাজপথ থেকে শুরু করে সংসদের অভ্যন্তর পর্যন্ত সব জায়গায় যাতে এই তরুণদের জোরালো কণ্ঠস্বর শোনা যায় এবং তারা ন্যায়বিচার পায়, তা তারা নিশ্চিত করবেন। উল্লেখ্য, ভারতের পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানোর দাবিতে গত সোমবার হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী পার্লামেন্ট বা সংসদ ভবন অভিমুখে এক বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রার আয়োজন করেছিল, যা রাজধানী নয়াদিল্লিতে এক নজিরবিহীন, উত্তেজনাকর ও শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা করে।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের এই বিশাল জনস্রোত সব বাধা অতিক্রম করে যখন সংসদ ভবনের মাত্র কয়েক মিটারের মধ্যে চলে আসে, তখন সেই অপ্রতিরোধ্য জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ প্রশাসন চরম বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের পাশাপাশি নির্বিচারে ব্যাপক লাঠিচার্জ করেন।
পুলিশের এই কঠোর ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সোমবারের ওই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ১০০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য এবং অন্তত ৬০ জনেরও বেশি সাধারণ বিক্ষোভকারী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের ওপর এই নির্মম ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় সংসদে আলোচনার দাবি তুলেছেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রেখেছেন যে, নিজেদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামা নিরীহ ও নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের কেন এমন নৃশংস লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের মুখোমুখি হতে হলো?
একই সঙ্গে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানতে চেয়েছেন, কেন একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ ভবন কার্যত সিল করে দেওয়া হলো এবং সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলো?
বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কলঙ্কজনক ঘটনা এবং এর ফলে দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী তরুণ-তরুণীর অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক দুর্ভোগের দায় শেষ পর্যন্ত কে বা কারা নেবে, সেই প্রশ্নও তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন।
সর্বশেষ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই পুরো ঘটনার নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়ভার সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, সরকারকে কোনো ধরনের টালবাহানা বা কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে সংসদে এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার পরও সরকারের এই নীরবতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি কঠোর মন্তব্য করেন। সব মিলিয়ে, শিক্ষাব্যবস্থার এই গভীর সংকট এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন রীতিমতো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যা আগামী দিনগুলোতে বিরোধী দলগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে মোদি সরকারকে আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।