মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিজেপির আন্দোলন অব্যাহত, তবে সংসদমুখী পদযাত্রা স্থগিত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম

সিজেপির আন্দোলন অব্যাহত, তবে সংসদমুখী পদযাত্রা স্থগিত
ছবি : Collected

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে দেশজুড়ে সৃষ্ট অস্থিরতা এখনো তীব্রভাবে বিরাজমান। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন অব্যাহত রাখার দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি।

 

তবে উদ্ভূত সংঘাতময় পরিস্থিতি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা আপাতত ভারতের সংসদ ভবন অভিমুখে নতুন করে আর কোনো পদযাত্রা বা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করবে না।

 

মঙ্গলবার সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দিপকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমকে জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, গত সোমবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের যে ভয়াবহ ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, মূলত তার পরিপ্রেক্ষিতেই দল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

 

ওই সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক নিরীহ সমর্থক ও শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার বিষয়টি তাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। তাই তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো কোনো আন্দোলনকারী, বিশেষ করে দেশের ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজকে আর নতুন করে কোনো ধরনের শারীরিক বা আইনি ঝুঁকির মুখে না ফেলা।

 

উল্লেখ্য, গত সোমবার ভারতীয় সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম এবং সরকারের চরম জবাবদিহিহীনতার প্রতিবাদে হাজারো বিক্ষুব্ধ জনতা সংসদ অভিমুখে এক বিশাল পদযাত্রার আয়োজন করেছিল।

 

কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ মিছিল আটকে দিতে দিল্লি পুলিশ রাস্তায় ব্যারিকেড বসায় এবং একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য ব্যাপক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে, যার ফলে পুরো এলাকা একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

 

এই নজিরবিহীন সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের পরিসংখ্যান নিয়ে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে। দিল্লি পুলিশের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, সোমবারের ওই সহিংস ঘটনায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ মোট প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন।

 

অন্যদিকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দাবি করেছেন যে, পুলিশি হামলায় আহত বিক্ষোভকারীর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তার দেওয়া তথ্যমতে, দেড় শতাধিক আন্দোলনকারী বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের এক দিন পর মঙ্গলবার এক আবেগঘন বার্তায় সমর্থকদের উদ্দেশে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন অভিজিৎ দিপকে। বিশেষ করে আন্দোলনে অংশ নেওয়া আহত নারী সমর্থকদের কাছে তিনি গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি স্বীকার করেন যে, দলের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত আরও উন্নত প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত ছিল। পুরুষ পুলিশ সদস্যরা যেভাবে নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম হামলা চালিয়েছেন, তার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি আক্ষেপ করেন যে, তাদের রক্ষার্থে তিনি হয়তো আরও কার্যকর ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারতেন।

 

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা করুণ বাস্তবতার কথা তুলে ধরে অভিজিৎ দিপকে আরও গুরুতর অভিযোগ করেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো এত বড় একটি জাতীয় সংকটের পরও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রক্ষা করতে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও দমনমূলক অবস্থান নিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করছে না।

 

তার দাবি অনুযায়ী, মেধাভিত্তিক এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হতাশা ও বঞ্চনার জেরে ইতিমধ্যে ২০ জনেরও বেশি নিরপরাধ শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, সংসদমুখী পদযাত্রা সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও তাদের মূল আন্দোলন কোনোভাবেই থেমে যাবে না।

 

শিক্ষার্থীদের সমস্ত ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে তাদের এই নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগৎ থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ যে আজ রাজপথের এক বিশাল গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, তা সোমবার রাজধানী দিল্লি ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই প্রমাণিত হয়েছে।

 

তবে দিল্লি পুলিশ বরাবরই দাবি করে আসছে যে, বিক্ষোভকারীরা অত্যন্ত সহিংস ও আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করেছেন এবং বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা জারি থাকা আইনি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জোরপূর্বক সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বিধায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে।

 

সোমবার যখন রাজপথে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ চলছিল, ঠিক সেই সময়ই সিজেপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পরিস্থিতি নিরসনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়। ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তারা সরকারের কাছে তিনটি প্রধান ও সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন।

 

তাদের দাবিগুলো হলো-কারাবন্দি বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের নিঃশর্ত মুক্তি, ব্যর্থতার দায়ভার গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ এবং নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে যে সমস্ত শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের প্রতিটি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এক কোটি রুপি করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।

 

সিজেপির পক্ষ থেকে সংসদমুখী মিছিল স্থগিতের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনাকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, এই কলঙ্কজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের ইতিমধ্যে দ্রুততার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর এই তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের পরপরই সংসদীয় বিষয়কমন্ত্রী কিরেন রিজিজুও একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়ে বলেন যে, পুরো বিষয়টি নিয়ে এখন একটি গঠনমূলক আলোচনা সঠিক পথেই এগোচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে রাজপথের পরিস্থিতি আর নতুন করে উত্তপ্ত না করাই সবার জন্য মঙ্গলজনক।

 

এদিকে, সোমবারের ভয়াবহ সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়ে যেসব বিক্ষোভকারী দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া বা আরএমএল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে সেখানে ছুটে যান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা।

 

একই হাসপাতালে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে এবং তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাতে উপস্থিত হন ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাও।

 

সোমবারের ওই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক নেতাদের তৎপরতার পর ভারতের রাজধানীর সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগের চেয়েও অনেক বেশি উত্তপ্ত ও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছে। সিজেপি আপাতত তাদের সংসদমুখী ঘেরাও কর্মসূচি থেকে পিছু হটলেও, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ অন্যান্য মৌলিক দাবি আদায়ের প্রশ্নে তারা যে একবিন্দুও ছাড় দিতে রাজি নয়, তা তাদের অনড় অবস্থানের মাধ্যমেই জাতির কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

 

- ইন্ডিয়া টুডে