মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ককরোচ পার্টির আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে কংগ্রেসের পদযাত্রা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

ককরোচ পার্টির আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে কংগ্রেসের পদযাত্রা
ছবি : Collected

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ ও নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে যে তুমুল গণ-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা এবার রাজনীতির একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

 

সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণদের অধিকার আদায়ের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-এর চলমান তীব্র আন্দোলনের সঙ্গে এবার প্রত্যক্ষভাবে রাজপথে নেমে একাত্মতা ঘোষণা করেছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।

 

এই মহাদুর্নীতির যথাযথ বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ জবাবদিহির দাবিতে মঙ্গলবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন অভিমুখে এক বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রা ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা।

 

এই পদযাত্রার মধ্য দিয়ে বিরোধী দলগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট একটি বার্তা দিয়েছে যে, দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই কলঙ্কজনক অধ্যায়কে তারা কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না।

 

বিরোধী দলের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিক মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং দলের প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রা।

 

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকেই কংগ্রেসের অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ মল্লিকার্জুন খাড়গের সরকারি বাসভবন রাজাজি মার্গে এসে জড়ো হতে শুরু করেন।

 

সেখানে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশের পর শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে বিশাল জনসমুদ্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন লোক কল্যাণ মার্গের উদ্দেশে তাদের পূর্বনির্ধারিত প্রতিবাদী পদযাত্রা শুরু করে।

 

রাজাজি মার্গ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত সুরক্ষিত বাসভবন লোক কল্যাণ মার্গের দূরত্ব এক কিলোমিটারের কিছু বেশি হলেও, এই পুরো পথজুড়ে বিক্ষোভকারীদের মুহুর্মুহু স্লোগান, ব্যানার ও পদচারণায় নয়াদিল্লির রাজপথ আক্ষরিক অর্থেই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

 

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো নয়াদিল্লি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছিল।

 

কংগ্রেসের এই মোদিবিরোধী ঘেরাও কর্মসূচি এমন এক স্পর্শকাতর ও উত্তপ্ত সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যার ঠিক এক দিন আগেই ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে আয়োজিত ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লিতে এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছিল।

 

গত সোমবার ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের ঠিক প্রথম দিনে প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে সিজেপি-এর হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী যখন অহিংস উপায়ে সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন পুলিশ তাদের পথ রোধ করে।

 

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত কঠোর ও দমনমূলক অবস্থান গ্রহণ করে এবং তাদের ওপর নির্বিচারে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ওই দিনের মর্মান্তিক ও সহিংস সংঘর্ষে পুলিশ, নিরাপত্তাকর্মী ও আন্দোলনকারী মিলিয়ে অন্তত ১৭৮ জন গুরুতর আহত হন, যাদের অনেকেই রক্তক্ষয়ী অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আন্দোলন দমন করতে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে জোরপূর্বক আটক করে। মঙ্গলবারের কংগ্রেসের এই কর্মসূচিতে সোমবারের সেই বর্বরোচিত পুলিশি হামলারও তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

 

উল্লেখ্য, সোমবারের সংঘাতের পর আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে দিল্লির একটি সরকারি হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। সেখানে তারা আহত তরুণদের সঙ্গে কথা বলে তাদের পাশে থাকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মঙ্গলবারের এই রাজপথের কর্মসূচিকে সেই প্রতিশ্রুতিরই সরাসরি বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

লাখ লাখ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভঙ্গের এই বিষয়টিকে কংগ্রেস এখন আর কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে তারা বর্তমান সরকারের চরম দায়িত্বহীনতা ও কাঠামোগত দুর্নীতি হিসেবে জাতির সামনে তুলে ধরতে চাইছে।

 

প্রতিযোগিতামূলক এই প্রবেশিকা পরীক্ষাতে দেশজুড়ে লাখ লাখ মেধাবী তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করে থাকেন, যাদের চোখে থাকে নিজ মেধার জোরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু পরীক্ষার আগেই অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালী চক্রের হাতে প্রশ্নপত্র চলে যাওয়ার এই ঘটনা দেশের সামগ্রিক মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতিকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

কংগ্রেস নেতারা তাদের পদযাত্রায় বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই বিশাল কেলেঙ্কারির দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। তারা অভিযোগ করেন যে, সরকার প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করছে এবং যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তাদের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

ভারতের জাতীয় রাজনীতির বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করতেই কংগ্রেস অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই পদযাত্রার আয়োজন করেছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাব্যবস্থার এই ত্রুটি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে যে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন, কংগ্রেস সেই ক্ষোভকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

 

ককরোচ জনতা পার্টির মতো একটি সম্পূর্ণ নতুন ও তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক দলের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের প্রতি কংগ্রেসের মতো শতাব্দীপ্রাচীন দলের এই প্রকাশ্য সমর্থন ভারতের বিরোধী রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই আন্দোলন কেবল আর শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সরকারের সামগ্রিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার এক বৃহত্তর ও আপসহীন রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

 

- এনডিটিভি