মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলোচনা চাইলে সরকারের মন্ত্রীদের আসতে হবে বিক্ষোভস্থলে, ককরোচ পার্টি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

আলোচনা চাইলে সরকারের মন্ত্রীদের আসতে হবে বিক্ষোভস্থলে, ককরোচ পার্টি
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা ঘিরে নজিরবিহীন সংঘর্ষ ও চরম বিশৃঙ্খলার ঠিক এক দিন পর আবারও ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে নিজেদের প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের নবীন রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি।

 

রাজপথের এই তীব্র আন্দোলনে নতুন করে উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ সংগঠনটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, দিল্লি পুলিশ রাতের অন্ধকারে বেআইনিভাবে তাদের প্রতিবাদের জন্য তৈরি করা মঞ্চ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

 

শত প্রতিকূলতা, পুলিশি ধরপাকড় এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক চাপ সত্ত্বেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার স্বার্থে তারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগের এক দফা দাবিতে এখনো পাহাড়ের মতো অনড় রয়েছে।

 

উল্লেখ্য, চলমান এই জাতীয় অস্থিরতা নিরসনের লক্ষ্যে মাত্র এক দিন আগেই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হয়ে নিজেদের সুনির্দিষ্ট লিখিত দাবিদাওয়া জমা দিয়েছিলেন সিজেপির শীর্ষ নেতারা।

 

কিন্তু সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত আলোচনার ফলাফল নিয়ে তীব্র হতাশা ও অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডার সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সিজেপির পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন দলটির অন্যতম মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাস।

 

দীর্ঘ বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আশুতোষ রাঙ্কা সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটিকে নিছক ‘সময়ের অপচয়’ এবং লোকদেখানো সান্ত্বনা বলে আখ্যায়িত করেন। সরকারের প্রতি চরম অনাস্থা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সামনে স্পষ্ট ভাষায় একটি নতুন ও চূড়ান্ত শর্ত ছুড়ে দিয়েছেন।

 

রাঙ্কা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, ভবিষ্যতে সরকারের কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি যদি চলমান এই সংকট নিরসনে তাদের সঙ্গে পুনরায় কোনো ধরনের অর্থবহ আলোচনা বা সংলাপে বসতে চান, তবে তাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল কক্ষ ছেড়ে সরাসরি যন্তর মন্তরের এই ধুলোমাখা বিক্ষোভস্থলেই আসতে হবে।

 

শিক্ষার্থীদের ঘাম ও রক্তের প্রতি সরকারের উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সরকার যদি রাজপথে নামা দেশের ভবিষ্যৎ কারিগর এই হাজার হাজার তরুণের মূল্যবান সময়ের কোনো মর্যাদা না দেয়, তবে আন্দোলনকারীরাও সরকারের মন্ত্রীদের বা প্রতিনিধিদের সময়ের কোনো মূল্য দিতে মোটেও প্রস্তুত নন।

 

এদিকে, পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার লক্ষ্যে এবং সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রার দিন ব্যাপক রক্তপাতের পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তিনজন সাধারণ শিক্ষার্থী সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বিবেচনা করে তাদের চলমান অনশন কর্মসূচি সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

 

কিন্তু ছাত্রসমাজের ওপর পুলিশি নিপীড়নের প্রতিবাদে নতুন করে আন্দোলনের উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়েছেন প্রখ্যাত সমাজকর্মী ও লাদাখের অধিকার আদায়ের লড়াকু নেতা সোনম ওয়াংচুক। বর্তমানে তিনি পুলিশি পাহারায় দিল্লির সফদারজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।

 

শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দিল্লি পুলিশের ‘নির্মম ও বর্বরোচিত আচরণের’ তীব্র নিন্দা জানিয়ে এই প্রবীণ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধিকারকর্মী হাসপাতালের বিছানাতেই আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য এক কঠিন ও আত্মত্যাগী অনশন কর্মসূচি শুরু করেছেন।

 

তার এই অনশন কর্মসূচি গোটা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টি নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করেছে। সফদারজং হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক আবেগঘন ও লিখিত বার্তায় সোনম ওয়াংচুক অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে জানিয়েছেন যে, তার এই আমরণ অনশন চূড়ান্ত ও মর্মান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সরকার হয়তো নিজের ভুল বুঝতে পেরে বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাধ্য হবে।

 

চরম সরকারি উসকানি, পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের নির্মম প্রয়োগ সত্ত্বেও তরুণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করে সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ওয়াংচুক।

 

তিনি এই লড়াকু তরুণ প্রজন্মকে দেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক ও বাহক বলে উল্লেখ করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে ভারতের জাতীয় সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের বঞ্চনার কথা ও যৌক্তিক দাবিদাওয়া উপস্থাপনের একটি উন্মুক্ত সুযোগ দেওয়া হয়।

 

ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা পুনরায় নিশ্চিত করেছেন যে, গত সোমবার বিকেলে জে পি নাড্ডার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের সময় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কাছে তারা যে সুনির্দিষ্ট লিখিত দাবিগুলো তুলে ধরেছিলেন, সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বা সন্তোষজনক কোনো জবাব বা সামান্যতম প্রতিক্রিয়া আসেনি।

 

তাদের পেশ করা এই প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে অবিলম্বে পুলিশি হেফাজত বা হাসপাতাল থেকে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়ভার কাঁধে নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের দ্রুত পদত্যাগ এবং মেধাভিত্তিক নিট পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে বা অভাবনীয় দুর্নীতির শিকার হয়ে হতাশাগ্রস্ত যেসব পরীক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিয়েছেন, তাদের প্রতিটি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ প্রদান।

 

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের এই নিয়মতান্ত্রিক লড়াই চলবে বলে ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে সরকারকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই নীরবতা ও আন্দোলনকারীদের কঠোর অবস্থান ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

- উইয়ন নিউজ