মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

ভারতে চিকিৎসা প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে উত্তাল রাজপথ
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশজুড়ে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে কিছুটা নমনীয় মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।

 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখার কথা জানালেও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার। সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারী ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

তবে আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো না মানা পর্যন্ত রাজপথ ছাড়তে রাজি নয় প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি রাজধানী দিল্লিতে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রশমিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

 

এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রাজপথে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে যান দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জে পি নাড্ডা।

 

একই দিনে আন্দোলন পরিচালনাকারী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নাড্ডার সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়। ওই বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের চলমান অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানানো হয়।

 

তবে ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্টভাবে জানান যে, শিক্ষার্থীরা কেবল কথার আশ্বাসে আন্দোলন থেকে পিছু হটবে না। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট ও মূল দাবি পেশ করা হয়েছে। সিজেপির দেওয়া এসব দাবির মধ্যে প্রথমত রয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ।

 

দ্বিতীয়ত, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার জেরে সৃষ্ট হতাশা ও মানসিক চাপে যেসব পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করে প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের প্রতিটি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে অন্তত এক কোটি রুপি করে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।

 

আর তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও লাদাখের অধিকার আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুককে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির স্পষ্ট বক্তব্য হলো, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই নিয়মতান্ত্রিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।

 

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২১ দিন ধরে অনশন পালনরত জনপ্রিয় সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে গত শনিবার জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের আগুন রাজপথে নতুন গতি পায়। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পরদিন রোববার হাজার হাজার শিক্ষার্থী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে সমবেত হয়ে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ গড়ে তোলে।

 

এরপর সোমবার বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে হাজার হাজার আন্দোলনকারী সংসদ ভবন অভিমুখে শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের পথ রোধ করে দিল্লি পুলিশ। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করা হয়, যার ফলে শিক্ষার্থী ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এতে উভয় পক্ষের বহু মানুষ গুরুতর আহত হন।

 

চলমান এই অভূতপূর্ব সংকটের মধ্যেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার এক বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, শিক্ষাব্যবস্থার মেধা মূল্যায়নে এ ধরনের অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

 

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু পুনরুল্লেখ করেন যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুনরাবৃত্তি রুখতে ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে সরকার ইতিমধ্যেই দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে।

 

অন্যদিকে, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নিপীড়নের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে বিরোধী দল কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তীব্র সমালোচনা করে তাকে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে তরুণবিরোধী প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুবিচারের দাবি নিয়ে রাজপথে নামা দেশের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্ম আজ সরকারের কাছ থেকে যৌক্তিক জবাব পাওয়ার পরিবর্তে নির্মম লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের সম্মুখীন হচ্ছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সংলাপে বসার আশ্বাস এবং অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর টানা রাজপথের অবস্থানের কারণে ভারতের শিক্ষা আন্দোলন কেন্দ্রিক এই রাজনৈতিক উত্তাপ আগামী দিনগুলোতে আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে।

 

- এনডিটিভি