মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ভারতে ছাত্র বিক্ষোভ

‘দেশটা আপনার বাবার নয়’, মোদিকে কড়া হুঁশিয়ারি কেজরিওয়ালের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

‘দেশটা আপনার বাবার নয়’, মোদিকে কড়া হুঁশিয়ারি কেজরিওয়ালের
ছবি : Collected

ভারতের চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান ছাত্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তাপ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাঝেই এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তীব্র ও নজিরবিহীন ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক এবং প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

 

ক্ষমতাসীন সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ভারতের আপামর জনসাধারণ স্বৈরশাসকদের উপযুক্ত ও ঐতিহাসিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

 

পুলিশি ধরপাকড় ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করার সরকারি চেষ্টার প্রতিবাদে কেজরিওয়ালের এই তীক্ষ্ণ মন্তব্য ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণ ও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

মঙ্গলবার আয়োজিত এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল মূলত দিল্লি পুলিশের একটি সাম্প্রতিক পদক্ষেপের দিকে ইঙ্গিত করেন এবং সরকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

 

অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন যে, মোদি সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশ প্রশাসন সম্প্রতি একটি গণমাধ্যম বিজ্ঞপ্তি জারি করে চরম দমনমূলক নীতির আশ্রয় নিয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত সোমবার রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের সকলের বিরুদ্ধে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক অভিযোগপত্র দায়ের করবে।

 

সরকারের এই ভীতিকর ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি উদ্দেশ করে কেজরিওয়াল বলেন, “মোদিজি, এই দেশটা আপনার বাবার নয়; এই বিশাল দেশ ১৪০ কোটি সাধারণ মানুষের।

 

সাধারণ জনগণকে এভাবে ভয়ভীতি দেখানো এবং হুমকি দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করুন। অন্যথায় এ দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ আপনাকে এমন এক চরম শিক্ষা দেবে যে, একজন স্বৈরাচারী একনায়কের পরিণতি কতটা শোচনীয় হতে পারে, ইতিহাস তা চিরকাল মনে রাখবে।”

 

অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এই বিস্ফোরক সংবাদ সম্মেলনের ঠিক আগেই ভারতের প্রথম সারির প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

 

ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত সোমবারের ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যেই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি পৃথক অভিযোগপত্র দায়ের করেছে।

 

রাজধানী শহরের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও শান্তি বিনষ্ট করার নেপথ্যে কোনো বৃহত্তর ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে কি না, তা অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নিবিড় তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

 

দায়ের করা এই মামলাগুলোতে মূলত পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা সৃষ্টি করা, ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন এবং কর্তব্যরত সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের ওপর বেআইনিভাবে হামলা চালানোর মতো অত্যন্ত গুরুতর ও জামিন অযোগ্য আইনি অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

নির্ভরযোগ্য প্রশাসনিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে যে, তদন্তকারী দলের সদস্যরা বর্তমানে ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকার সুরক্ষামূলক ক্যামেরার দৃশ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করছেন।

 

আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে, বিশেষ করে চেহারা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সংবলিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার দৃশ্য ব্যবহার করে প্রকৃত অপরাধী ও আন্দোলনকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভরত জনতা সেসময় সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ও অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে। অন্তত ১৫ থেকে ২০টি সরকারি যানবাহন এবং রাস্তায় থাকা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগী করে দেওয়া হয়েছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতায় সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল ও এর আশপাশ থেকে প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা গোটা দেশজুড়ে তরুণ সমাজের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

 

এই জঘন্য অনিয়মের একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের আইনি তদন্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার দায়ভার গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর নিঃশর্ত পদত্যাগের এক দফা দাবিতে গত সোমবার রাজধানী দিল্লিতে ভারতের জাতীয় সংসদ ভবন অভিমুখে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি।

 

দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা কয়েক হাজার ক্ষুব্ধ তরুণ ও সাধারণ শিক্ষার্থী নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার তাগিদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। একটি সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদযাত্রা হিসেবে শুরু হলেও, বিশাল এই জনসমুদ্র যখন সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন পুলিশ তাদের বিশাল প্রতিবন্ধক দিয়ে জোরপূর্বক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে।

 

এর ফলে একপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এবং সশস্ত্র পুলিশের মধ্যে এক ব্যাপক, অসম ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের কারণে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো রাজধানী জুড়ে চরম আতঙ্ক ও অস্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরি হয়, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে দেশটির গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে একটি গভীর দাগ কেটেছে।

 

- ইত্তেফাক