মঙ্গলবার দিল্লির লোক কল্যাণ মার্গে অবস্থিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে তাঁদের পাশাপাশি কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের সংসদ সদস্য ও শীর্ষনেতাকে বলপূর্বক আটক করে পুলিশ।
চিকিৎসা পরীক্ষার অনিয়ম নিরসন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা এই গণবিক্ষোভে কেন্দ্রীয় সরকারের এমন কঠোর ও দমনমূলক আচরণ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার, যখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভয়াবহ জালিয়াতির স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বানে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক দিল্লির রাস্তায় নেমে আসেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিজেদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এবং সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। কিন্তু পদযাত্রাটি সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর চরম লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং নির্বিচারে মারধর চালায়।
এতে বহু শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন এবং গোটা এলাকা এক উত্তপ্ত রণাঙ্গনে পরিণত হয়। আন্দোলনকারী নিরপরাধ তরুণদের ওপর প্রশাসনের এই অন্যায্য ও অমানবিক হামলার পর দিনই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব রাজপথে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত সোমবার শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো পুলিশি হামলার সরাসরি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবার সকালে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হন।
তারা লোক কল্যাণ মার্গ এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে সরকারের স্বৈরাচারী নীতি ও শিক্ষার্থীদের অধিকার হননের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি তারা শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত দাবির বিষয়ে সুস্পষ্ট সরকারি রূপরেখা ঘোষণার দাবি জানান।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক কিছু দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হলেও, আন্দোলনরত কংগ্রেস নেতারা শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ও সুবিচারের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান।
দীর্ঘ সময় অবস্থান ধর্মঘট চলায় পুরো এলাকা জুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলে দিল্লি পুলিশ। অবস্থান কর্মসূচি দীর্ঘায়িত হওয়ার পর একপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ শুরু করে।
পুলিশ সদস্যরা জোরপূর্বক রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ উপস্থিত কংগ্রেস নেতাদের টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে আটক করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা যখন বলপ্রয়োগ করে রাহুল গান্ধীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িতে তুলছিলেন, তখন তাঁর নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল।
একজন সাবেক জাতীয় দলের শীর্ষনেতা এবং বিরোধী দলীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ওপর এই ধরনের পুলিশি হেনস্থা ও শারীরিক আঘাতের ঘটনা দেশটির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আগে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তীব্র ক্ষোভ ও চরম প্রতিবাদ ব্যক্ত করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। অত্যন্ত আবেগাপ্লুত ও কঠোর কণ্ঠে তিনি বলেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো নৃশংস ও অন্যায্য হামলার দায়ভার মোদি সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
ভারতীয় তরুণ সমাজ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের সোনালি ভবিষ্যৎ চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, লাখ লাখ তরুণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপরাধে নরেন্দ্র মোদির অনতিবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করা উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এই নজিরবিহীন আটক ও রক্তপাতের ঘটনা ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন বিরোধ সৃষ্টি করেছে এবং সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।