বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি পেশ করলেন রাহুল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ১১:২০ এএম

ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি পেশ করলেন রাহুল
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের চলমান নতুন প্রজন্মের বা জেন-জি শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন এবং তাদের ওপর পুলিশের ধারাবাহিক কঠোর অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

 

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে মাঠে নেমেছে দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস।

 

শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় গত ২১ জুলাই, মঙ্গলবার কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ দলের আরও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।

 

যদিও দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গলবার রাতেই তাদের সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়, তবে এই আটকের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন লোক কল্যাণ মার্গের সামনে আয়োজিত একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিলে সেখানকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

 

মূলত সেখানেই রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং অন্যান্য কংগ্রেস নেতাদের আটক করা হয়। আটকের পর রাহুল গান্ধীকে ছত্রশাল স্টেডিয়াম এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে মন্দির মার্গ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের এভাবে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

 

পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ নেত্রী সোনিয়া গান্ধী মন্দির মার্গ থানায় গিয়ে মেয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন শেষে রাতের বেলা এই দুই শীর্ষ নেতাকে পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

 

তবে আটক থাকা অবস্থাতেই রাহুল গান্ধী একটি বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট পাঁচটি দাবি তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ও ন্যায্য আন্দোলনকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন না করে সরকারের উচিত অবিলম্বে কার্যকরী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

 

ভিডিও বার্তায় রাহুল গান্ধী তার দাবিগুলো অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন। তার প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, চলমান এই শিক্ষা সংকটের দায়ভার কাঁধে নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ করা।

 

পাশাপাশি, গত সোমবার আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে পুলিশি হামলা হয়েছে, তার সঙ্গে জড়িত সকল পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে, নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে, তা অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানান তিনি।

 

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এমন অমানবিক অভিযানের জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে জাতির সামনে ক্ষমা চাইতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া, উদ্ভূত এই জাতীয় সংকট নিরসনে সংসদে একটি পূর্ণাঙ্গ ও গঠনমূলক আলোচনা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে যুগান্তকারী সংস্কার আনার দাবিও তিনি তার বার্তায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

বিক্ষোভ চলাকালীন রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, বর্তমান প্রশাসন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে চরম অন্যায় আচরণ করছে। বিশেষ করে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভারতের মতো একটি বিশাল দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেন এভাবে ভেঙে পড়ছে, তা এক বিরাট প্রশ্ন।

 

বারবার কেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে এবং কেন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, সেই যৌক্তিক প্রশ্নগুলো তিনি তুলে ধরেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে কেন আর্থিকভাবে চরম সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে, সেই বিষয়েও তিনি সরকারের জবাবদিহিতা দাবি করেন।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, এসব প্রশ্ন তোলা দেশের প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং এতে কোনো ভুল নেই। বিরোধী দলের সকল সদস্যই চান যেন আসন্ন বুধবার লোকসভা এবং রাজ্যসভায় এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে একটি বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

সেই সঙ্গে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাহসিকতার প্রশংসা করে তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যকার রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

 

বিরোধীদের দাবি, নিটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের কারণে লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারের মুখে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের এসব দাবির কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং অভিযোগ করেছেন যে, রাহুল গান্ধী প্রথমে সংসদে আলোচনার দাবি জানালেও এখন হঠাৎ করে মন্ত্রীদের পদত্যাগের মতো অযৌক্তিক দাবি তুলছেন, যা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

 

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও কংগ্রেসের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছেন যে, সরকার শুরু থেকেই সংসদে এই বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।

 

কিন্তু বিরোধী দল শিক্ষার্থীদের আবেগ ও সমস্যাকে পুঁজি করে নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে চাইছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সমস্যার সমাধানের চেয়ে এই আন্দোলনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করাই কংগ্রেসের মূল উদ্দেশ্য।