শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাশ্মীরে বিক্ষোভকারীদের ‘ভারতের মতো শত্রু’ আখ্যা দিলেন খাজা আসিফ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০১:২১ পিএম

কাশ্মীরে বিক্ষোভকারীদের ‘ভারতের মতো শত্রু’ আখ্যা দিলেন খাজা আসিফ
ছবি : Collected

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চলমান গণবিক্ষোভ এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের বিপরীতে সামরিক বাহিনীর চরম কঠোর অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে এক নতুন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ।

 

নিজ দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ভূখণ্ডের অধিকারকামী সাধারণ নাগরিকদের এই গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক আন্দোলনকে তিনি সরাসরি প্রতিবেশী এবং চিরবৈরী রাষ্ট্র ভারতের সমতুল্য শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, এমন এক সময়ে এই অপ্রত্যাশিত ও অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মন্তব্যটি সামনে এলো, যখন ওই অঞ্চলে পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযানে বহু সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

 

একটি রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির এমন মন্তব্য চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাঝেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি বিতর্কিত ভিডিও বার্তায় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন ভাষায় মন্তব্য করতে দেখা যায়।

 

ওই ভিডিওবার্তায় তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, আজাদ কাশ্মীর বা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে যারা বর্তমান বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছেন, তাদেরকে তিনি ভারতের মতোই চরম শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেন এবং উভয়কেই তিনি সম্পূর্ণ একই কাতারে রাখেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মুখ থেকে এমন শত্রুতাপূর্ণ, বিদ্বেষমূলক ও উসকানিমূলক মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের মাঝেও তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও চরম নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।

 

এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য একটি রাষ্ট্র ও তার সাধারণ নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্ককে ভবিষ্যতে আরও বেশি শোচনীয় ও সংঘাতময় করে তুলবে বলে জোরালো আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই রাজনৈতিক ও উত্তেজনাকর মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তান অধিকৃত অঞ্চলে ঘটে চলা এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নির্মম বাস্তব চিত্র।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, রাওলাকোট এলাকায় গত দুই দিনে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার ও বেপরোয়া গুলিতে অন্তত বত্রিশ জন কাশ্মীরি বিক্ষোভকারী নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। তবে এই দীর্ঘ ও শোকাবহ মৃত্যুমিছিল কেবল গত কয়েক দিনের নয়।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, গত পাঁচই জুন থেকে ওই অঞ্চলে শুরু হওয়া এই গণআন্দোলনে এখন পর্যন্ত নব্বই জনেরও বেশি মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষ করে মীরপুর শহরের পরিস্থিতি আরও বেশি ভয়াবহ, শ্বাসরুদ্ধকর ও অমানবিক হয়ে উঠেছে। সেখানে মোতায়েন থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যে এবং নির্বিচারে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী গুলি ছুড়ছেন।

 

এমনকি পরবর্তীতে নিহতদের নিথর দেহ অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু লোমহর্ষক ও অমানবিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে বলে স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি তাদের এক বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

 

সাম্প্রতিক এই রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশই ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ বা জেএএসি-এর সক্রিয় কর্মী ও একনিষ্ঠ সমর্থক। দীর্ঘকাল ধরে ওই অঞ্চলে ঘটে চলা নানাবিধ কাঠামোগত মানবাধিকার লঙ্ঘন, চরম বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই স্থানীয় সংগঠনটি অত্যন্ত সোচ্চার ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছিল।

 

নিজেদের অধিকার আদায়ের এই অবিচল ও আপসহীন অবস্থানের কারণে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তথা ইসলামাবাদ ইতিমধ্যেই এই সংগঠনটিকে বেআইনি ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ আখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

 

সাম্প্রতিক এই বর্বরোচিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে এই অধিকারকামী সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য উমর নাজিরের ছোট ভাই উসমান নাজিরও রয়েছেন। স্বজনের এই মর্মান্তিক মৃত্যু আন্দোলনকারীদের আরও বেশি বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

 

মূলত ওই অঞ্চলে ঘটে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যখন সাধারণ মানুষ বিপুল সংখ্যায় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসেন, ঠিক তখনই পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী তাদের ওপর এই চরম মাত্রায় দমন-পীড়ন ও বলপ্রয়োগ শুরু করে।

 

উদ্ভূত এই চরম শ্বাসরুদ্ধকর, ভীতিকর ও সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে জেএএসি তাদের নীতিগত অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরেছে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে তারা পাকিস্তান সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছে যে, অধিকার আদায়ের এই সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তারা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করেনি বা কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়নি।

 

উল্টো তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে দাবি করেছে যে, রাওলাকোট তাদের নিজস্ব শহর ও পৈতৃক জন্মভূমি, যা দীর্ঘকাল ধরে অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। নিরপরাধ, নিরস্ত্র এবং সাধারণ স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর নির্বিচারে টিয়ারশেল ও প্রাণঘাতী গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর, এখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করছে।

 

সংগঠনটির জোর দাবি, এই সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে সরকার সম্পূর্ণ ভুল, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে ছড়াচ্ছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন এবং সত্যকে আড়াল করার এক গভীর ষড়যন্ত্র।

 

- এনডিটিভি