শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ অবমাননায় কঠোর শাস্তির বিধান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’ অবমাননায় কঠোর শাস্তির বিধান
ছবি : Collected

ভারতের জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’-এর অবমাননাকে একটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে নতুন আইন প্রণয়নের পথে আরও একধাপ অগ্রসর হলো দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের জাতীয় প্রতীক ও সম্মানজনক বিষয়াবলির মর্যাদা রক্ষার্থে এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

গত বুধবার, ঊনত্রিশে জুলাই, ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় এই লক্ষ্যে আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল কণ্ঠভোটে চূড়ান্তভাবে পাস হয়। ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ নামক এই খসড়া আইনটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে ‘বন্দে মাতরম’ অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিল পাসের মাধ্যমে ভারত সরকার তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও সুসংহত করার একটি বড় বার্তা প্রদান করেছে। রাজ্যসভায় বিলটি পাসের দিন সংসদীয় অধিবেশনে এক উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোর আইনপ্রণেতারা অধিবেশন চলাকালে ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ জানান এবং একপর্যায়ে তারা সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে যান।

 

মূলত, দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী নিট বা জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন চলছে, সেই আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বিরোধী দলগুলো।

 

তারা এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দাবি করে সংসদের ভেতরে স্লোগান দিতে থাকেন। এই তুমুল হট্টগোল ও বিক্ষোভের মধ্যেও রাজ্যসভার স্পিকার অধিবেশনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন এবং উপস্থিত সদস্যদের আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য বারবার আহ্বান জানান।

 

তবে কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালে যখন বিলটির ওপর তার নির্ধারিত বক্তব্য প্রদান শুরু করেন, ঠিক তখনই বিরোধী দলগুলোর সদস্যরা তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রেখে একযোগে সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন।

 

সংসদ কক্ষ থেকে বিরোধী দলের সদস্যদের বেরিয়ে যাওয়ার পর বিলটির পক্ষে জবাবি বক্তব্য উপস্থাপন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। তিনি তার বক্তব্যে বিরোধী দল, বিশেষ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেন।

 

তিনি অভিযোগ করে বলেন যে, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করার রাজনীতি করতে গিয়ে কংগ্রেস দল ঐতিহাসিক ‘বন্দে মাতরম’-এর মর্যাদা ও গরিমা ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

 

তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দেশের অগণিত বিপ্লবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তেও অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি উচ্চারণ করেছিলেন।

 

সেই ঐতিহাসিক ও আবেগঘন একটি সংগীতের প্রতি কংগ্রেস কেন এমন বিরোধিতাপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করছে, তা তার কাছে একেবারেই বোধগম্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে, একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ ভারত বিনির্মাণের ক্ষেত্রে ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো অনুপ্রেরণাদায়ী সংগীতের যে অপরিসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে, তা তিনি সংসদ সদস্যদের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

 

প্রস্তাবিত এই নতুন আইনি সংশোধনীর মূল লক্ষ্য হলো ভারতের জাতীয় প্রতীকগুলোর সুরক্ষা ও সম্মান সুনিশ্চিত করা। এই সংশোধনী অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় পতাকা, পবিত্র সংবিধান, জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ এবং জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’-সহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতীকের যেকোনো ধরনের অবমাননা, অসম্মান বা অমর্যাদা প্রদর্শনকে একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

 

যদি এই বিলটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হয়, তবে এসব জাতীয় প্রতীকের অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত কোনো ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।

 

কারাদণ্ডের পাশাপাশি ওই ব্যক্তির ওপর আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা হতে পারে, অথবা অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড উভয় শাস্তির বিধানই একসঙ্গে কার্যকর করার সুযোগ এই আইনে পরিষ্কারভাবে রাখা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য যে, এর আগে গত চব্বিশে জুলাই ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় এই সংশোধনী বিলটি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়েছিল। এই বিলের মধ্য দিয়ে মূলত ‘বন্দে মাতরম’-কে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর সমপর্যায়ের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদানের একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত কালজয়ী এই ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি রচনার সার্ধশত বা একশত পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারত সরকার দেশব্যাপী যে বছরব্যাপী উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, আইনি সুরক্ষার এই বিল পাসের উদ্যোগটি তারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

রাজ্যসভায় সফলভাবে অনুমোদিত হওয়ার পর বিলটি এখন ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ বা লোকসভায় উপস্থাপন করা হবে। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হওয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক সম্মতি ও স্বাক্ষর লাভের পরই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আইন হিসেবে সমগ্র ভারতে কার্যকর হবে।

 

- এনডিটিভি